নির্বাচনকালীন সরকার থেকে জাতীয় পার্টির (জাপা) মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পদত্যাগ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর ছিল উত্কণ্ঠা। তবে জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের বুধবারের নির্দেশ অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে কেউই পদত্যাগ করেননি। দিনভর নানা তত্পরতা শেষে এরশাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সন্ধ্যা ৬টায় জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, তিনি নিজে এবং দলের প্রেসিডিয়ামের তিন সদস্য- জিএম কাদের, মুজিবুল হক চুন্নু ও সালমা ইসলাম দলীয় চেয়ারম্যানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। রওশন এরশাদও পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন, তিনিও লোক মারফত দলীয় চেয়ারম্যানের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেবেন। আর ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর সঙ্গেও তার (মহাসচিবের) টেলিফোনে কথা হয়েছে, তারাও দলীয় প্রধানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলে তাকে জানিয়েছেন।

রুহুল আমিন সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, এরশাদের সঙ্গে দলের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সরকারে থাকা মন্ত্রী-উপদেষ্টারা সবাই দলীয় চেয়ারম্যানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এরপর আজ শুক্রবার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ চিকিত্সা শেষে দেশে ফিরলে তার সঙ্গে দেখা করে এইচএম এরশাদ দলীয় মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পদত্যাগপত্র বুঝিয়ে দেবেন।

এরশাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে জাপা দলীয় দুই মন্ত্রী- বেগম রওশন এরশাদ ও রুহুল আমিন হাওলাদার এবং প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু দুপুর সোয়া ১২টা থেকে প্রায় ২টা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৈঠক করেন। তারা যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান তখন তাদের কারও গাড়িতেই পতাকা ছিল না। সেখান থেকে বের হয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা না বলে হাওলাদার ও চুন্নু সরাসরি চলে যান রাজধানীর বারিধারায় এরশাদের বাসায়। আর রওশন যান নিজের বাসায়। পরে বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে এরশাদের বাসায় যান প্রতিমন্ত্রী সালমা ইসলাম। হাওলাদার, চুন্নু ও সালমাসহ দলের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন এরশাদ। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুপুরে বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা হয়। এসময় এরশাদের বাসায় ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালকসহ গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে এরশাদের বাসায় আসেন জিএম কাদের। আর পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাপা চেয়ারম্যানের বাসায় আসেন রাত সোয়া ৮টার দিকে। তবে রাত সাড়ে ৯টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন বাবলু দলীয় প্রধানের বাসায় যাননি। ব্যারিস্টার আনিস ও বাবলু পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন কিনা তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয় কার কাছে

নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা জাপার তিন মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রী দলীয় প্রধানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে দলটির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার জানালেও এনিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এরশাদ সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে তার দলের মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলে যে কথা জানানো হয়েছে, সেটি নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সংবিধানে বলা আছে, মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা (প্রধানমন্ত্রী ছাড়া) রাষ্ট্রপতিকে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের চতুর্থভাগে নির্বাহী বিভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ‘প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা’ সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ ৫৮(১)-এ বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন মন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, যদি- (ক) তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’

এ ব্যাপারে জাপার কয়েক নেতার কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, যেহেতু এটা নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার, সে কারণে এখানে রাষ্ট্রপতিই মুখ্য। তাছাড়া জাপা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেয়াকে মর্যাদার মনে করছে। অবশ্য এ ব্যাপারে সাংবিধানিক প্রশ্ন এড়িয়ে যান তারা।

উল্লেখ্য, এরশাদের ভাই ও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের মহাজোট সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন আগে থেকেই। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করলে জাপা থেকে ডাক পান আরো ছয় জন। গত ১৯ নভেম্বর শপথের পর দপ্তর বণ্টনে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পানিসম্পদ, মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মুজিবুল হক চুন্নুকে যুব ও ক্রীড়া এবং সালমা ইসলামকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। এছাড়া মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ পান জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। বুধবার উপদেষ্টাদের দপ্তর বণ্টন করা হয়েছে, তাতে বাবলুকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব দেয়া হয়।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রওশন এরশাদ, রুহুল আমিন হাওলাদার ও মুজিবুল হক চুন্নুর বৈঠকে এরশাদের বর্তমান কথাবার্তা ও অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তবে এরশাদের এই অবস্থানকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন জাপার তিন নেতার একজন জানান, প্রধানমন্ত্রীকে রওশন বলেছেন ‘আপনারা এরশাদ সাহেবের শেষ মামলাটি ঝুলিয়ে রেখেছেন, তাকে সেখান থেকে মুক্ত করে দিন। কথা দিয়েও আপনারা মঞ্জুর হত্যা মামলাটি শেষ করেননি। তারপর রংপুরে এরশাদের আসনে, গাইবান্ধায় আমার আসনসহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সকল নেতার আসনে আপনারাও প্রার্থী দিয়ে রেখেছেন। এসব কারণে এরশাদ সাহেব কষ্ট পেয়েছেন। তারপর কিছু কথা বলার পর তার বাড়ির সামনে র‌্যাব-পুলিশ বসে আছে। এই বয়সে লোকটার যে কোনো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।’ রওশনের এসব কথার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মামলা তো আদালতের ব্যাপার। আর আসন নিয়ে যে কথাগুলো বললেন, সেগুলো মীমাংসার সময় তো চলে যায়নি। এর আগেই ওনার (এরশাদ) এত রাগ কেন?’

রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের দলের রাজনৈতিক সত্তা ও এরশাদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেছি।’

এরশাদ এখনও অনড়

দলীয় নেতাদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও মনোভাব জানার পরেও নিজ অবস্থানে এখন পর্যন্ত অটল রয়েছেন এরশাদ। গতকাল বিকালে দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এবং এর আগে-পরেও বিচ্ছিন্নভাবে অনেকের সঙ্গে আলাপে এরশাদ বলেছেন ‘সরকার যতোই চাপ দিক, যতোই প্রতিশ্রুতি দিক, আমি আর তাদের সঙ্গে যেতে পারবো না। দেশের কোথাও সরকারের সঙ্গে মানুষ নেই। তাছাড়া আমি এখন যেভাবে অবস্থান নিয়েছি, সেখান থেকে পিছু হটলে রংপুরের মানুষই আমাকে এলাকায় ঢুকতে দেবে না।’

প্রতিমন্ত্রী সালমা ইসলামও সকালে এরশাদের সঙ্গে তার বাসায় দেখা করেছেন। দুপুর ১২টার দিকে এরশাদের পিএস মেজর (অব.) খালেদ আকতার সাংবাদিকদের বলেন ‘মন্ত্রিসভায় যারা রয়েছেন তাদের সবাইকে পদত্যাগ করতে হবে। চেয়ারম্যান বলেছেন, যারা পদত্যাগ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

রাত সোয়া ৭টার দিকে এরশাদ বাসা থেকে নিচে নেমে এসে ব্যক্তিগত স্টাফদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘আমি বাইরে যাবো, গাড়ি কোথায়, গাড়ি রেডি করো।’ অবশ্য কয়েক মিনিট পর তিনি আবার লিফটে বাসায় উঠে যান। রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত জানা গেছে, গাড়ি প্রস্তুত করে রাখা হলেও এরশাদ বাইরে যাননি।

এরশাদের বাড়ির সামনে বিব্রত আনিস

নির্বাচনকালীন সরকারে থাকা জাপার দুই মন্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ ও রুহুল আমিন হাওলাদার এবং দুই প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও সালমা ইসলাম গতকালও এরশাদের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করেছেন। গতকাল সারাদিন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও জিয়াউদ্দিন বাবলু। রাত সোয়া ৮টায় ব্যারিস্টার আনিস বারিধারায় এরশাদের বাড়ির সামনে পৌঁছালে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে তিনি দ্রুত এরশাদের বাসায় উঠে যান। গতকাল বিকালে এরশাদের সঙ্গে অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাসহ দলের কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা বৈঠক করলেও তাতেও যোগ দেননি আনিস ও বাবলু। যদিও রুহুল আমিন হাওলাদার জানিয়েছেন, তার সঙ্গে আনিস ও বাবলুর টেলিফোনে কথা হয়েছে এবং তারাও পদত্যাগপত্র জমা দেবেন, তবে এনিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য।

গতকাল সন্ধ্যায় এরশাদের বাসায় যাওয়া জাপার একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈঠক থেকে মহাসচিবসহ কয়েকজন একাধিকবার আনিস ও বাবলুর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। তবে তারা দু’জন ফোন রিসিভ করেননি। শেষ পর্যন্ত এরশাদ তার বর্তমান অবস্থানে অনড় থাকলে এবং অন্যরা মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও এই দুই নেতা ভিন্ন অবস্থান নিতে পারেন বলে জাপায় জোর গুঞ্জন রয়েছে। আনিস-বাবলু মন্ত্রিসভায় থেকে যেতে পারেন এবং তাদের নেতৃত্বে জাপায় আরেক দফা ভাঙ্গন দেখা দিতে পারে বলেও নেতা-কর্মীদের ধারণা।

সচিবালয়ে অফিস করেছেন জিএম কাদের

মন্ত্রিসভা থেকে জাপার পদত্যাগ নিয়ে উত্কণ্ঠা ও ব্যাপক কৌতূহল থাকলেও গতকাল সচিবালয়ে অফিস করেছেন জিএম কাদের। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে স্বাভাবিক কার্যক্রম করেছেন তবে গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পতাকাবাহী গাড়িতেই তিনি অফিসে যাতায়াত করেছেন। এমনকি সন্ধ্যায় যখন তিনি এরশাদের বাসায় যান তখনও তার গাড়িতে পতাকা ছিল।

তবে সন্ধ্যা ৬টায় রুহুল আমিন হাওলাদার সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন ‘জিএম কাদেরও ইতিমধ্যে এরশাদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।’ এর ঘণ্টা খানের পরে এরশাদের সঙ্গে দেখা করার পর বেরিয়ে যাওয়ার সময় জিএম কাদের সাংবাদিকদের বলেন ‘আমি এখন পদত্যাগপত্র দিয়ে গেলাম।’

গতকালও নিরাপত্তা জোরদার ছিল

এরশাদের বারিধারার বাসভবনের চারপাশে গতকাল বিকালের দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি আবারও বাড়ানো হয়েছে। সকাল থেকে র্যাব-পুলিশের উপস্থিতি কম থাকলেও সন্ধ্যার দিকে তা বাড়ানো হয়।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here