আবদুল গাফফার চৌধুরী

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে পোলারাইজেশন ঘটেছে দুটি স্পষ্ট ধারায়। এক ধারায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, যাকে বলা হয় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শিবির। অন্য ধারায় রয়েছে মুখে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধিতা না করলেও এই আদর্শের বিরোধী শিবির। প্রথম শিবিরটিতে রয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব। অন্য শিবিরটিতে রয়েছে বিএনপির নেতৃত্ব।

আওয়ামী লীগের জন্ম গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে। বিএনপির জন্ম সেনা ছাউনিতে। প্রতিষ্ঠাতাও একজন সেনা শাসক। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সেনা শাসন প্রবর্তনের জন্য সেনা শাসকরা সমর্থন খুঁজতে বাধ্য হয়েছিলেন ’৭১-এর পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি, ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তি এবং এককালে চীনপন্থী হিসেবে পরিচিত একদল বিভ্রান্ত বামদের কাছ থেকে। এদের সম্মিলনেই বিএনপির রাজনৈতিক দল হিসেবে অভ্যুদয়।
গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরোধী অথচ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক অথবা তাতে অংশগ্রহণ করেছেন এমন কিছু নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং কেউ কেউ এখনও আছেন। কিন্তু জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানে মুসলিম লীগ যেমন সম্পূর্ণভাবে সাম্প্রদায়িক ও কট্টর রক্ষণশীল নেতৃত্বের হাতে চলে যায়, বাংলাদেশে তেমনি জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি ধীরে ধীরে তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হারায় এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রবীণ নেতা ও কর্মীরা দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন।

’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী জামায়াত জনগণের কাছে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় বিএনপির ভেতরে আশ্রয় নেয়। ড্রাক্যুলার কামড়ে যেমন জীবিত মানুষ ড্রাকুলা হয়ে যায়, তেমনি জামায়াতের বাহুবন্ধনে বিএনপি ধীরে ধীরে ড্রাকুলা হয়ে যায়। বিএনপির এই চরিত্র বিচ্যুতি সম্পূর্ণ হয় তারেক রহমান সাবালক হয়ে কার্যত বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর। তিনি প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত একই পরিবারের লোক।’ ফলে তারেকের ইচ্ছায় ও মদদে বিএনপিকে জামায়াত সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলে। দেশের রাজনৈতিক পোলারাইজেশন সম্পূর্ণ হয়। বিএনপিতে ধীরে ধীরে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও আদর্শের বিরোধী গোত্রগুলো সম্মিলিত হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুসারী অধিকাংশ ডান ও বাম রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির এই পোলারাইজেশনটা স্পষ্ট ছিল। এই দুই শিবিরের মধ্যে বিরোধ ও সংঘাতও কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এই বিরোধ দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সাধারণ বিরোধ নয় যে, তা দুপক্ষ সংলাপে বসলেই মীমাংসা হয়ে যাবে। এজন্য এই দুই শিবিরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি সূত্র আবিষ্কৃত এবং দুই শিবির কর্র্র্তৃক তা স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই সূত্রটি এখনও আবিষ্কৃত না হওয়ায় সংঘাত ক্রমশ হিংসাত্মক চরিত্র ধারণ করছে।

ভারতে জন্ম নেয়া জামায়াত সৌদি আরব ও আমেরিকার মদদপুষ্ট একটি উগ্র এবং সন্ত্রাসী ধর্মান্ধ দল। ১৯৭১ সালে তারা বাংলাদেশে বিদেশী হানাদারদের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাকা-ে অংশগ্রহণ করে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার চেষ্টা করে। স্বাধীন বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধের বিচার ও দ-ের মুখোমুখি হয়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় নির্মম সন্ত্রাস, রক্তপাত, হত্যাকা- দ্বারা গণতান্ত্রিক শিবিরকে ধ্বংস করতে চাইছে। বিএনপির গণতান্ত্রিক পরিচয়কে তারা কভার হিসেবে ব্যবহার করছে। জামায়াতের এই কার্যকলাপে বিএনপি সহজে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে এখন ইচ্ছুক পার্টনার (রিষষরহম ঢ়ধৎঃহবৎ)।

এটা একাত্তরের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট সংঘাত, এটা দুইটি রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সাধারণ মতপার্থক্য কিংবা কেবল ক্ষমতার হাতবদলের লড়াই নয়। এটা সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের লড়াই। একাত্তরে এই প্রতিবিপ্লবী গণবিরোধী শক্তি গণহত্যায় শরিক হয়েছিল বাংলাদেশকে পাকিস্তানের পদানত রাখার জন্য, বর্তমানে তারা একই হত্যা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি অনুসরণ করছে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পাকিস্তান বা তালেবান রাষ্ট্র বানানোর জন্য। দুর্ভাগ্যক্রমে বিএনপি এখন এই অসুর শিবিরের নেতা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ তার গণতান্ত্রিক চরিত্রের সব ত্রুটিবিচ্যুতি, স্খলন পতন নিয়ে অসুর বিনাশের অসাম্প্রদায়িক শিবিরের নেতা।

দেশের রাজনীতির এই স্পষ্ট বিভাজনটি এখনও সাধারণ দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট নয়। তার কারণ বিএনপি-জামায়াতের প্রচারযন্ত্রের ক্রমাগত গোয়েবলসীয় মিথ্যা প্রচার। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এই মিথ্যা প্রচার শুরু হয়েছিল। বলা হয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ ইসলাম ধ্বংসের ষড়যন্ত্র, ভারতের দালালেরা এই ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে।’ কিন্তু এই মিথ্যা প্রচার হালে পানি পায়নি। কারণ, বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া কর্মীরা ছিলেন তখন অত্যন্ত সজাগ ও সক্রিয়। কিছু ভাড়াটে ও দালাল বুদ্ধিজীবী ছাড়া সকলেই মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেন। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার জবাব দেন এবং অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দেশের ভেতরে সক্রিয় এই বুদ্ধিজীবীদের হানাদার পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের দোসর জামায়াত দুই দফায় (মার্চ ও ডিসেম্বর ’৭১) নির্মমভাবে হত্যা করে।
এই পাইকারি বুদ্ধিজীবী হত্যার ফলে বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি ও উদারচিন্তার ক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় তা এখন পর্যন্ত দূর হয়নি। স্বাধীনতা-উত্তর নব্য বুদ্ধিজীবী শ্রেণী গড়ে ওঠে। স্বাধীনতাপরবর্তী যে নতুন নতুন সামাজিক ও আর্থিক সুযোগ সুবিধা লাভের দরজা খুলে যায়, তার বদৌলতে এই নতুন এলিট ক্লাস বা সুশীল সমাজ তৈরি হয় এবং তাদের একটা বড় অংশ সহজেই ভিজিলেজ্্ড ক্লাস হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়ে নীতিবর্জিত চরম সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানী হয়ে ওঠে। এরাই এখন দেশের মিডিয়া, টেলিভিশনের টকশো ইত্যাদি দখল করে আছে এবং সাধারণ মানুষকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করে চলেছে।

দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের শিবিরের যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের রাজনীতি, এক্ষেত্রে এই বুদ্ধিজীবীরা একাত্তরের বুদ্ধিজীবীদের মতো সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারতেন এবং দেশের মানুষকে এই অপশক্তির দ্বারা সৃষ্ট বিভ্রান্তির কুয়াশা থেকে মুক্ত করে একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ করে গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার বাংলার ভবিষ্যত রক্ষা করতে পারতেন। এজন্য তাদের আওয়ামী লীগের পক্ষে দাঁড়াবার কোন দরকার ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের শত্রু ও মিত্রদের মধ্যে আজ যে রাজনীতির পোলারাইজেশন, তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তারা দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে পারতেন।

তারা তা করেননি। তারা দেশী-বিদেশী নানা সুযোগসুবিধা, আর্থিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির লোভে নিরপেক্ষতার একটি মুখোশে নিজেদের ঢেকে দেশের দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতির মাঝখানে যে অবস্থান গ্রহণ করেছেন তা প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য ক্ষতিকারক এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্য চৌদ্দ আনা দায়ী। এখন আমেরিকাই বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। তার হাতেই সর্বপ্রকার খ্যাতি, সুযোগসুবিধা ও অর্থনৈতিক প্রাপ্তির স্বর্গরাজ্যের চাবিকাঠি। মেফিস্টোফিলিস ও ফার্ডসেটর কাহিনীর মতো আমাদের বুদ্ধিজীবীদের এই অংশটি অন্য আরও পাঁচটা উন্নয়নশীল দেশের মতো এই মহাপরাক্রমশালী বিশ্ব ধনবাদ ও নব্য সাম্রাজ্যবাদের কাছে নিজেদের বিবেক বিক্রি করে বসে আছেন।

অনুন্নত ও দরিদ্র বিশ্বের মানুষ সহজেই কমিউনিজম ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে ঝোঁকে। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোর নির্বাচিত সরকারগুলোও সহজে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে পরাশক্তির আজ্ঞাবহ হতে চায় না। সেজন্য বড় বড় নন গবর্নমেন্টাল অর্গানাইজেশন (এনজিও) এবং দারিদ্র্য বিমোচনের নামে মাইক্রোক্রেডিট সিস্টেম বা ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার প্রবর্তন। প্রমাণিত হয়েছে, বহু দেশেই বড় বড় এনজিও হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের পাল্টা আরেকটি সরকার। তারা বিদেশী অর্থ ও সাহায্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সাহায্যদাতা দেশগুলো কোন দেশের নির্বাচিত সরকারকে দুর্নীতিপরায়ণ, ব্যর্থ সরকার আখ্যা দিয়ে এনজিওগুলোকেই দেশের ও গরিবের ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখায়। এসব এনজিওর দেশীপ্রধানদের নাইটহুড, নোবেল পুরস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত করে তাকে দেশের মানুষের কাছে পরম সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি করে তোলার চেষ্টা হয়।

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোন দলেরই নির্বাচিত সরকারকে পশ্চিমা ধনবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের পছন্দ নয়। আওয়ামী লীগ এক সময় সমাজতন্ত্রের কথা বলেছে এবং তার একটা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা ছিল এবং এখনও ছিঁটেফোঁটা রয়ে গেছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতিতে আল কায়দা, তালেবানদের প্রভাব রয়েছে বলে আমেরিকা ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা ভয় করে। যতদিন তাদের এই ভয় ছিল না, ততদিন তারা (আমেরিকা) জামায়াতকে ‘আধুনিক গণতান্ত্রিক মুসলিম রাজনৈতিক দল’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছে এবং বিএনপিকে ক্ষমতায় রাখতে চেয়েছে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ২০০১ সালের নির্বাচনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এ্যান মেরি পিটার্সের নির্লজ্জ, প্রকাশ্য ভূমিকা স্মরণ করা যেতে পারে। এই পশ্চিমা অভিভাবকদের নির্দেশেই বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজটি, তাদের মুখপত্র একাধিক মিডিয়া বিএনপি-জামায়াতকে নির্বাচনে জয়ী করার জন্য প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে, তারপর প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ করে। ঢাকার ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সহসা আবিষ্কার করেন, ‘বাংলাদেশে সেনা শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তক।’

মাহফুজ আনাম লেখাপড়া জানা লোক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও স্বাধীন সার্বভৌম পার্লামেন্টের সংজ্ঞা কিভাবে দেয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না তা ভাবতে আমার কষ্ট হয়। যে পার্লামেন্টে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে না; জাতীয় বাজেট ভোটাভুটির ভিত্তিতে পাস হয় না; পাস করেন সর্বক্ষমতাসম্পন্ন প্রেসিডেন্ট, তাকে কি বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সেই পার্লামেন্টকে কি সার্বভৌমত্বের অধিকারী পার্লামেন্ট বলা হয়? যদি বলা যায়, তাহলে আইয়ুবের আমলে কি পাকিস্তানে বহুদলীয় সরকার ও স্বাধীন সার্বভৌম পার্লামেন্ট ছিল? পাকিস্তানে আইয়ুবের শাসনামলকে তাহলে কেন সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনামল বলা হয়? তার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনই বা কেন করতে হয়েছিল?

একদিকে মাহফুজ আনামের ভূমিকা, অন্যদিকে ২০০১ সালেই সদ্য প্রকাশিত প্রথম আলোর সম্পাদক হিসেবে মতিউর রহমানের ভূমিকাটি স্পষ্ট হতে থাকে। দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে যে রাজনীতির পোলারাইজেশন ঘটছে এবং আওয়ামী লীগ তার সব ভুলত্রুটি, পতন স্খলন সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিবিরের নেতা এই সত্যটি থেকে দেশবাসীর চোখ ফিরিয়ে নেয়ার জন্য তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে একই দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে বিএনপির তালপ্রমাণ অপরাধকে আওয়ামী লীগের তিলপ্রমাণ অপরাধের সমান করে দেখাতে থাকেন এবং প্রচার করতে থাকেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরোধ কেবল ক্ষমতা দখলের বিরোধ এবং দুজনই একই চরিত্রের নেত্রী। এই প্রচারণার আড়ালে মতিউর রহমানের সমর্থনের পাল্লাটা ছিল বিএনপির দিকেই। এখনও আছে।

২০০১ সালের এই পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পরিবর্তিত। ভারত-আমেরিকা মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। টেরোরিজম দমনেÑ তা ইসলামিক হোক আর আঞ্চলিক হোক, দুটি দেশই জোটবদ্ধ। আমেরিকায় ওবামা প্রশাসন আগের প্রশাসনের মতো বাংলাদেশের বিএনপি-জামায়াত জোটের ওপর সুপ্রসন্ন নয়; অবশ্য বিরূপও নয়। তবে তালেবান ও আফগান জঙ্গীদের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক বুঝতে পেরে জামায়াত সম্পর্কে তাদের আগের মোহ নেই। জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিএনপি সম্পর্কেও ওবামা প্রশাসন সন্দিহান। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজেনা সাহেব তাঁর নিয়োগ কর্তাদের এই সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য চেষ্টা তদবির করছেন। কিন্তু এখনও পেরে উঠছেন না।

মৌলবাদী সন্ত্রাসের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্কটি বুঝে ওঠার পরেই তাদের আবার ক্ষমতায় বসানোর জন্য ওয়াশিংটন আগের মতো উৎস্যুক নয়। তার ওপর আবার নতুন মিত্র ভারতের চাপ আছে। তাই আওয়ামী লীগ তাদের পছন্দের দল না হওয়া সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতায় থাকাটাকে আমেরিকা সমর্থন দিয়েছে, হয়ত এখনও দিচ্ছে।
তার আগে তারা চেষ্টা করেছিল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলকেই ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে মাইনাস টু ফর্মুলা অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর সহায়তায় একটি অনির্বাচিত সিভিল সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে। ফলে বাংলাদেশের কথিত সুশীল সমাজে, বিগ এনজিওগুলোতে, ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ এতদিনের ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। নোবেল পুরস্কার গলায় ড. ইউনূস নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে এগিয়ে আসেন। দেশী-বিদেশী শক্তিশালী মহলের এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তবে প্রচেষ্টাটি পরিত্যক্তও হয়নি।

২০১৪ সালের নির্বাচন সামনে নিয়ে আমাদের এই সুশীল সমাজ, বিগ এনজিও ও তাদের ক্রোড়াশ্রিত মিডিয়া আবার নতুন আশায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা জানে, ওয়াশিংটনের কাছে আওয়ামী লীগ পছন্দের দল নয়। তবু দেশটি জঙ্গীবাদের কবলে যাবে এই ভয়ে ওয়াশিংটন-দিল্লী দুই শক্তিই আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চাইছে। বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে তাদের মনে এখনও প্রচ- ভয় তারা ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ প্রশ্রয় পাবে। এখন কিভাবে তাদের এই মনোভাব বদল করে বাংলাদেশের কথিত সুশীল সমাজের বহুদিনের স্বপ্ন অনির্বাচিত একটি সরকার প্রতিষ্ঠা দ্বারা তারা ক্ষমতায় যেতে পারেন এবং সেজন্য ওয়াশিংটন ও দিল্লীর সমর্থন ও সাহায্য আদায় করতে পারেন সেটাই তাদের একমাত্র ভাবনা।

তাদের এই উদ্দেশ্যটি পূরণের জন্য বাংলাদেশে ‘আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণভাবে জনসমর্থন হারিয়েছে’ এবং ‘বিএনপির জনসমর্থন হু হু করে বাড়ছে’ এই প্রচার। এই লক্ষ্যেই ঘন ঘন জনমত সমীক্ষার ফল প্রচার করা হচ্ছে। যাতে বিদেশী বড় শক্তিগুলো ভয় পায় যে, আওয়ামী লীগের বদলে এবার বিএনপি (কোলে বসে জামায়াত) ক্ষমতায় আসবেই এবং বাংলাদেশেও জঙ্গীবাদের অভ্যুত্থান ঘটবে। এই আশঙ্কা প্রতিরোধের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এখনই যুদ্ধের মাঠ থেকে সরিয়ে অনির্বাচিত একটি সরকার দেশটিতে ক্ষমতায় বসানো দরকার।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে জার্মানির গোয়েবলসও এভাবে নাৎসিদের ক্ষমতায় আনার জন্য কমিউনিস্টদের নির্বাচন জয়ের ভয় দেখিয়ে ব্রিটেন ও আমেরিকার সমর্থন তাদের দিকে টেনে এনেছিল এবং এই ভয় দেখানোর কাজে সাজানো জনমত সমীক্ষাকে কাজে লাগিয়েছিল। আমাদের কথিত সুশীল সমাজ অবশ্য নাৎসি দল নয়। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য অভিন্ন, জনগণের ম্যান্ডেট না নিয়ে বিদেশী শক্তির স্বার্থে ও তাদের সমর্থনে ক্ষমতায় যাওয়া।
তবে এভাবে একটি এনজিও-নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠা দ্বারা তারা ক্ষমতায় যেতে না পারলে নির্বাচনে বিএনপির দিকেই তাদের সমর্থন থাকবে। ড. ইউনূস ইতোমধ্যেই সে পথ তাদের দেখিয়েছেন। কারণ, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এই এলিট ক্লাসের স্বার্থ সুবিধা যতটা রক্ষা পায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে তা রক্ষা পায় না। নীতি ও আদর্শ এই সুশীল সমাজ থেকে বহুদিন আগে বিদায় নিয়েছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here