milonমাহবুব কবির মিলন

চট্টগ্রাম বন্দরে আটক চালানের প্রাথমিক পরীক্ষায় কোকেনের উপস্থিতি ধরা পড়েনি। আরও উন্নত পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সন্দেহ এখনো যায়নি। বলিভিয়া থেকে আমদানি করা কিন্তু জাহাজে মাল উঠেছে উরুগুয়ের মণ্টিভিডিও থেকে। সূর্যমুখী তেল দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এত ক্যারিকেচার করে নিয়ে আসার মত এত ভাল বান্দা সত্যিই বিরল এই দেশে!! তার উপর উপর আবার আমদানিকারককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!!

মাদক ব্যবসায়ীরা কত চালাক আর ধুরন্ধর হতে পারে তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে গেল। আমি তখন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ পরিচালক চট্টগ্রাম। প্রতিদিন ৪/৫ টা করে মামলা এবং অভিযান। দিনরাত সমানে ছুটে চলেছি। প্রত্যেকটি অভিযানে নিজে থাকতাম যাতে কেউ প্রভাবিত বা কোন ম্যানিপুলেশন করতে না পারে।

পতেঙ্গা এলাকা তখন বিয়ার আর মদে সয়লাব। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি এই মদের ব্যবসায় জড়িত। যে কোন বাড়িতে ঢুকলেই বস্তায় বস্তায় মদ বিয়ার। দিনে দিনে কঠিন হয়ে গেল আমার অভিযান। আর মদ বিয়ার পাই না। সহজ রাস্তাকে কঠিন করে ফেলল মদ ব্যবসায়ীরা। একদিন গোপনে সংবাদ পেলাম একটা বাড়িতে শতাধিক বস্তা মদ বিয়ার আছে। বাড়িতে ঢোকার আগেই সব পলাতক। খালি বাড়ি, কেউ নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু পেলাম না। ইনফর্মারকে রিং দিলাম, বলল স্যার আছে খোঁজেন। খুঁজে না পেয়ে আবার রিং। একটু সময় নিয়ে সে বলল, স্যার দেখেন তো পাশে পুকুর আছে কিনা? সাথেই পুকুর দেখলাম। স্যার সোজা ডুব দেন। সাঁতার জানা আমার ৭/৮ কর্মচারীকে এক কাপড়ে নামিয়ে দিলাম। ঐ পুকুরে পাওয়া গেল প্রায় ৮০ বস্তা মদ বিয়ার। নেশা ধরে গেল। পাশের পুকুরেও তাদের নামালাম। সেখানেও প্রচুর বস্তা পাওয়া গেল।

ফিরে এসে পরেরদিন থেকে সবগুলোর জ্বর সর্দি। কোন মাফ নেই। আবার পুকুরে খালে অভিযান, আর ট্রাকে ট্রাকে মাল জব্দ। আমার লোকদের কষ্টের কথা চিন্তা করে পরে অনেকগুলো নোঙ্গর (হুক) বানালাম। আর পুকুরে নামতে হয় না। দড়ি দিয়ে জালের মত ফেলে টান দিলেই বস্তা আটকে যেত। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের পাশের খালে যে কত বস্তা মদ পেয়েছি তার হিসেব নেই। একবার একঘরে মাল আছে বলে সংবাদ পেয়ে হয়রান হয়ে শেষে সংবাদদাতাকে ফোন দিলাম। ‘স্যার অবশ্যই আছে। খোঁজেন”। না নেই আবার খুঁজলাম। “স্যার একটু লাফান তো!” সারা রুম লাফিয়ে এক কোণে “ধপ ধপ” শব্দ পেলাম। বললাম, পেয়েছি। সেখানকার মাটি খুঁড়ে নিচে একটি গোপন কুঠরিতে পাওয়া গেল ভর্তি মদ। একবার পেলাম চুলার নিচের একটি কুঠরিতে। মাটির চুলা উপরে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। একবার পেলাম গরুর খামারের গোবর ভর্তি ডোবায় ৫০ বস্তা মদ। এরপর সহজে আর কোন চালান পাইনি।

স্যার পুরাণ রেল স্টেশনের গোডাউনে অনেক ফেন্সিডিল আছে। গোডাউনের সব মাল খুঁজে কিছুই পেলাম না। এক-জায়গায় দেখলাম কয়েকটা তক্তার বান্ডিল। প্রতিটি বান্ডিলে দশটা করে তক্তা মোটা তার দিয়ে বাঁধা। ততদিনে আমার সন্দেহের কার্যকর ক্ষমতা ৮০% পৌঁছেছে। তার কেটে উপরের তক্তা সরাতেই দেখা গেল মাঝের তক্তাগুলো কেটে কুঠরি বানানো হয়েছে, সেখানে ভর্তি ফেন্সিডিল। প্রায় প্রতিটি লোকাল এবং মেইল ট্রেনে ফেন্সিডিল পেতাম।

রেল স্টেশনের পাশের বরিশাল কলোনি তখন হেরোইন গাঁজা আর ফেন্সিডিলের রমরমা বাণিজ্য। কত তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে সেখানে। হেরোইনের নেশায় আসক্ত কত শ্রেণী আর পেশার লোককে ধরেছিলাম সেখানে যা বলা সম্ভব নয়। বরিশাল কলোনির সার্ভিস ল্যাট্রিনের মলের ভিতর থেকেও পলিথিনের প্যাকেট মোড়ানো হেরোইন উদ্ধার করেছি কয়েকবার।

অসংখ্য সে কাহিনী, অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য মামলা আর অভিযান। ৪/৫ টি জেলার দায়িত্বে ছিলাম। অসংখ্য প্রেশার আর তদ্বির। কোনটিই রাখিনি।

সংবাদ পেলাম, কক্সবাজারের সরকার দলীয় এক ডাকসাইটে ক্ষমতাবানের এক লোকের এক ট্রাক বিয়ার আসছে। ট্রাক ধরে দেখলাম ঝিনুক ভর্তি। ট্রাকের নাম্বার চেহারা সব ঠিক আছে কিন্তু ওভারলোডেড অবস্থায় ভর্তি ঝিনুকের বস্তা। হতাশ হয়ে পড়লাম। কি করি!! এত বস্তা নামানো সম্ভব নয়। রাস্তায় জ্যাম সৃষ্টি হয়ে গেছে। চিকণ একটি লোহার রড ঢুকিয়ে জোরে গুঁতা দেয়া হল। দেখলাম ট্রাকের নিচ দিয়ে পবিত্র বিয়ার বের হচ্ছে। প্রায় সাড়ে নয় হাজার ক্যান বিয়ার।

তিন দিনের মাথায় আমার বদলীর আদেশ পেলাম। মাদক দ্রব্য থেকে প্রত্যাহার করে আমাকে বরিশাল বদলি করা হয়েছে। অনেক কষ্ট করে বরিশাল নামটা কাটিয়ে হাইবারনেশনে চলে গেলাম। লুকিয়ে থাকলাম প্রায় ৪ বছর।

লেখকঃ বাংলাদশ সরকারের যুগ্ন সচিবঃ

শেয়ার করুন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here