J News
শিউলির পৃথিবীতে হঠাত্ আঁধার!

 ‘ইয়াবা না কি জানি নেশা খায়। সেদিন নেশার পরিমাণ বেশি হইছিল। উনি সারাক্ষণই ঘরে থাকে, তারপরেও আমারে সন্দেহ করে। বলে ঘরে কে আইছিল? সেই কথা বলতে বলতেই আমার মুখে স্কচটেপ মারে। দুই হাত পেছন দিকে বান্ধে। দুই পা বান্ধে। এক সময় বুঝি আমার এক চোখ নাই, আমি আন্ধার দেখি। এরপর বেহুঁশ হইয়া যাই। জ্ঞান ফিরে একসময় দেখি খালি অন্ধকার। হাতের বান্ধন একটু আলগা মনে হইলে; হাত খুইলা, মুখের স্কচটেপ টাইন্যা খালি চিত্কার দেই। আর কিছুই কইতে পারি না।’

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নিজের দুই চোখ নষ্ট করে ফেলার আগ মুহূর্তের বর্ণনা দিচ্ছিলেন টঙ্গীর গৃহবধু শিউলি খাতুন (৩৬)। বৃহস্পতিবার বিকালে পারিবারিক কলহের জের ধরে গাজীপুরের টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুরের শহীদ স্মৃতি স্কুল রোড এলাকার ভাড়া বাসায় ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর থেকে শিউলির স্বামী জুয়েল হাসান কামাল পলাতক।

স্থানীয়রা জানান, ঘটনার দিন জুয়েল চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্ত্রীর চোখ নষ্ট করে ভেতরে রেখেই ঘর তালাবদ্ধ করে চলে যান। পরে শিউলির চিত্কার শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙে শিউলিকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার  ডাক্তার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সুপারিশ করেন। এরপর দীর্ঘ যানজট ঠেলে রাত পৌনে একটার দিকে তাকে আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার আতিকুল হক গৃহবধূ শিউলির চোখ দেখে আঁঁতকে ওঠে বলেন, ‘মানুষ কেমনে করে এই কাজ..!’

আতিকুল হক সাংবাদিকদের জানান, শিউলির দুই চোখের ভেতরে আর কিছু নেই। শুধু চোখের অবয়ব আছে। অবস্থা খুব ভয়াবহ। চোখের নার্ভের সঙ্গে মস্তিষ্কের নিবিড় সম্পর্ক আছে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ মিলে এই রোগীর চিকিত্সার ব্যবস্থা নিতে হবে। আজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগগুলো বন্ধ। আমি অন্য বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আজ শনিবার রোগীর চোখে অস্ত্রোপচার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শিউলি জানান, পাঁচ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। তবে এটি তার দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই তিনি দেখেন স্বামী নেশা করে। আগের স্বামীর কাছ থেকে যে সম্পত্তি পাবেন, তা এনে দেওয়ার জন্য প্রায়ই তাকে মারধর করতেন। আর নেশার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে তার চরিত্র নিয়ে প্রায়ই সন্দেহ প্রকাশ করতেন। আজেবাজে কথা বলেতেন।

শিউলির ভাই রনি বলেন, শিউলির আগের স্বামী ২০০৯ সালে খুন হন। এর এক বছরের মাথায় শিউলি তার স্বামীর চাচাতো ভাই জুয়েলকে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে শিউলির পরিবার রাজি ছিল না। তাই সবার সঙ্গে তার একটা দূরত্ব তৈরি হয়। আগের ঘরে শিউলির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিবে আর বড় ছেলেও পড়াশোনা করছে। তারা তাদের দাদার বাড়িতে থাকে।

শিউলিকে উদ্ধারকারী আলী আহমেদ বলেন, শিউলি ও জুয়েল দম্পতি বাসা ভাড়া নেয়ার পর থেকে তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকতো। ঘটনার দিন তাদের বাসা ছেড়ে দেওয়ার নোটিশও দেয়া হয়। জুয়েল বিকেল চারটার দিকে ঘটনা ঘটিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা মেরে বেরিয়ে যান। এরপর থেকেই জুয়েল পলাতক।

প্রসঙ্গত, জুয়েল হাসান টঙ্গীতে ইট-বালুর ব্যবসা করেন। ঘটনার পর শিউলির পরিবারের পক্ষ থেকে গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here