Report

 

চট্টগ্রামে ৪ জঙ্গি আটক, বিপুল অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার

দেশে শহীদ হামজা ব্রিগেড (এসএইচবি) নামে নতুন জঙ্গি গোষ্ঠীর সন্ধান পেয়েছে র‍্যাব। বাংলাদেশে ইসলামী শাসন কায়েম করা এবং প্রতিবেশী মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এই জঙ্গি গোষ্ঠীর কথিত প্রধান লক্ষ্য।

র‍্যাব ৭ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের ফয়‘স লেক এলাকার একটি হোটেলে গোপন বৈঠকের মধ্য দিয়ে এসএইচবি’র যাত্রা শুরু। বর্তমানে গ্রিন, ব্লু ও হোয়াইট এই তিনটি শাখায় বিভক্ত হয়ে এই সংগঠনটি কাজ করছে। প্রতিটি শাখায় ৭ জন করে সদস্য রয়েছে। এসএচবি’র সদস্যরা মূলত ইসলামী ছাত্র শিবিরের বহিষ্কৃত সদস্য হলেও বর্তমানে তাদের সাথে শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই বলে র‍্যাব জানায়।

শিবিরের বর্তমান নমনীয় ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে বেশ কিছু সংখ্যক শিবির কর্মী ‘ইসলামের শত্রুদের’ দমন করার মানসে এসএইচবিতে যোগ দিয়েছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে দেশের কিছু কওমী মাদ্রাসা নামধারী প্রতিষ্ঠান, যারা ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে জঙ্গি প্রশিক্ষণ চালিয়ে আসছে। গত দুই মাসে নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গি সংগঠন এসএইচবির ২৫ সদস্যকে আটক করেছে র‍্যাব। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

র‍্যাব ৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এসএইচবি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সদস্য সংগ্রহ করে। তাদের মূল টার্গেট শিবিরের বহিষ্কৃত সদস্য এবং কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। সদস্য সংগ্রহ করার পর কওমী মাদ্রাসা নাম দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। দেশে এবং মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে মুসলিম নির্যাতনের ভিডিও চিত্র দেখিয়ে তাদেরকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তোলা হয়। জিহাদি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা হয়। যাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিহিংসা লক্ষ্য করা হয় তাদেরকেই এসএইচবি’র সদস্য করা হয়।

লে কর্নেল মিফতাহ আরো জানান, দীর্ঘদিন ধরে এসএইচবি’র কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি ছিল র‍্যাবের। দীর্ঘ নজরদারির পর প্রথম অভিযান হয় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার একটি কওমী মাদ্রাসায়। সেখান থেকে জঙ্গি সন্দেহে ১২ জনকে আটক করে র‍্যাব। তারাও ছিল এসএইচবি’র সদস্য। তবে অন্যান্য সদস্যদের ধরা কঠিন হবে বিবেচনা করে এসএইচবির নাম গোপন রাখে র‍্যাব। হাটহাজারী থেকে আটক ১২ জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে নগরী ও জেলায় আরো দুই দফা অভিযান চালায় র‍্যাব। ২২ ফেব্রুয়ারি বাঁশখালী উপজেলার লটমনি পাহাড়ে একটি খামারে অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ সামগ্রীসহ ৫ জনকে আটক করা হয়। ৬ দিন পর নগরীর হালিশহর থানার গোল্ডেন কমপ্লেক্স আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও বোমা বানানোর সরঞ্জামসহ এসএইচবি’র আরো ৪ জঙ্গিকে আটক করা হয়।

জঙ্গি গোষ্ঠী এসএইচবির বিরুদ্ধে র‍্যাবের সাম্প্রতিক অভিযান শুরু হয় গত রবিবার বেলা ১১টায়। গতকাল সোমবার বেলা ১১টা পর্যন্ত টানা ২৪ ঘণ্টার অভিযানে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এক আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ এসএইচবি’র তিন সক্রিয় সদস্য র‍্যাবের জালে ধরা পড়ে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৫টি একে ২২ রাইফেল, ৫টি বিদেশি পিস্তল, ১টি এসবিবিএল বন্দুক, ১টি এলজি, একে ২২ রাইফেলের ১০টি ম্যাগজিন, ৫টি পিস্তলের ম্যাগজিন, বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৩২০০ রাউন্ড গুলি ও ১টি মটর সাইকেল।

আটককৃত এসএইচবি’র তিন সদস্য হলেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গি মো. সাব্বির আহমেদ মুহিব (২৩), মো. কামাল উদ্দিন মোস্তফা (২৪) ও মো. আশরাফ আলী আদনান (২৫)। আটক হওয়া অস্ত্র ব্যবসায়ীর নাম মোজাহের হোসেন মিয়া (৩৫)।

জানা গেছে, মোজাহের হোসেন চীন ও ভারত থেকে অস্ত্র এনে এসএইচবি’র কাছে বিক্রয় করতো। উদ্ধার হওয়া একে ২২ রাইফেলগুলো চীন সীমান্ত থেকে ক্রয় করে ভারতের মিজোরামের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে আনা হয়েছে। র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে মোজাহের জানায়, প্রতিটি রাইফেল সে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় কিনেছে। এগুলো এসএইচবি’র কাছে বিক্রি করা হয়েছে ৩ লাখ থেকে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকায়।  পিস্তলগুলো ভারত থেকে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা হয়েছে।

এই চারজনসহ গতকাল পর্যন্ত এসএইচবি’র সক্রিয় সদস্য এবং তাদের সহযোগীসহ মোট ২৫ জন র‍্যাবের হাতে আটক হয়েছে বলে লে কর্নেল মিফতাহ জানান।

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব ৭ অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে জানান, গত রবিবার আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে  জানতে পারি চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন রেলস্টেশনের বিপরীত দিকের আবাসিক হোটেল মিডটাউনে জঙ্গিরা অস্ত্র কেনাবেচা করবে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাবের একটি দল সকাল সাড়ে দশটার দিকে হোটেলের ২৫৯ নম্বর রুমে অস্ত্র কেনাবেচা করার সময় অস্ত্র ব্যবসায়ী মোজাহের হোসেন মিয়া ও জঙ্গি সংগঠন এসএইচবি’র সদস্য সাব্বির আহমেদ মুহিবকে আটক করে। এসময় তাদের কাছ থেকে ৪টি বিদেশি ৭ পয়েন্ট ৬৫ মি.মি পিস্তল ৪টি পিস্তলের ম্যাগজিন, ১ হাজার রাউন্ড পয়েন্ট টু টু বোরের গুলি, ১২ রাউন্ড ৭ পয়েন্ট ৬৫ মি.মি পিস্তলের গুলি ও একটি মটর সাইকেল উদ্ধার করা হয়। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রবিবার রাত ১২টার দিকে ঢাকায় পালানোর সময় মো. কামাল উদ্দিন মোস্তফা ও মো. আশরাফ আলী আদনান নামে আরো ২ জঙ্গিকে আটক করা হয়। গ্রেফতারকৃত জঙ্গিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, পাঁচলাইশ থানার কসমোপলিটন আবাসিক এলাকায় গ্রিন বাংলা জাহানারা অ্যাপার্টমেন্টে মাসুদ রানা ফাহাদ নামে এক ব্যক্তির বাসায় তাদের অস্ত্রের ভাণ্ডার মজুদ আছে। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে একটি স্টিলের আলমারির ভেতর থেকে ৫টি একে ২২ রাইফেল, ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি এসবিবিএল বন্দুক, ১টি এলজি, এক ২২ রাইফেলের ১০টি ম্যাগজিন, ১টি পিস্তলের ম্যাগজিন, ২১৫৫ রাউন্ড পয়েন্ট টু টু বোর পিস্তলের গুলি, ৫০১ রাউন্ড শটগানের গুলি উদ্ধার করে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে লে. কর্নেল মিফতাহ জানান, প্রাথমিকভাবে এসএইচবিকে চট্টগ্রামভিত্তিক সংগঠন বলেই মনে হচ্ছে। তবে এর অধিকাংশ সদস্যই চট্টগ্রামের বাইরের হওয়ায় দেশের অন্যান্য অংশেও এর নেটওয়ার্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। ইসলামী ছাত্র শিবিরের বহিষ্কৃত কিছু নেতাকর্মী ও স্বল্পসংখ্যক কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা মূলত এই সংগঠনের সদস্য। তিনি বলেন, সদস্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এসএইচবি কৌশলী ভূমিকা পালন করে। তারা মূলত টার্গেট করে ইসলামী ছাত্র শিবির থেকে বহিষ্কার হওয়া বিক্ষুব্ধ সদস্যদেরকে। এরা সাধারণত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র।

বর্তমানে শিবির কিছুটা নমনীয় অবস্থানে থাকায় এরা দলের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নয়। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে সংগঠন ত্যাগ করেছে অথবা তাদেরকে সংগঠন বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ এসব শিবির কর্মীকে এসএইচবিতে সদস্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ কওমী মাদ্রাসা ভালো হলেও কওমী মাদ্রাসা নামধারী কিছু প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে জঙ্গি প্রশিক্ষণ চলছে। এসব মাদ্রাসার ছাত্ররাও এসএইচবির সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here