hasuনারায়ণগঞ্জে আলোচিত ৭ খুনের মামলার অন্যতম আসামি হাসমত আলী হাসুর গ্রেফতার নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী লুকোচুরি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসু নিহত ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলামের দায়ের করা মামলার ৩ নম্বর আসামি। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ হাসুকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করছে না। সবাই বলছেন, গ্রেফতারের কথা শুনেছি; কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য নেই। আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ‘তিনি এখনো হাসুকে হাতে পাননি।’

অবশ্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল বুধবার সকালে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন, হাসুকে মঙ্গলবার গভীর রাতে যশোর সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করে।

এদিকে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিয়া; কিন্তু বাস্তবে তদন্তের দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। সিদ্ধিরগঞ্জ যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতির বাড়িতে গতকাল সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। আর এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ওয়ার্ড কমিশনার নূর হোসেনের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আজ আদেশ বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. মহিদ উদ্দিন খন্দকারও সরকারি বার্তা সংস্থা-বাসসের কাছে হাসুকে গ্রেফতারের কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, হাসুকে নারায়ণগঞ্জ আনার প্রস্তুতি চলছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাসসকে জানিয়েছেন, বিজিবি হাসুকে গ্রেফতার করেছে। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, অভিযুক্ত র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তার ‘আত্মসমর্পণ’ বা ‘আপিল’ করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। ওই কর্মকর্তারা গোয়েন্দা নজরদারিতেই আছেন বলে তিনি জানান।

হাসুর গ্রেফতার নিয়ে ধূম্রজাল

এদিকে হাসমত আলী হাসুকে গ্রেফতার নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসন হাসুকে গ্রেফতারের বিষয়টি ওয়াকিবহাল না হলেও গতকাল সকালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে মঙ্গলবার গভীর রাতে হাসুকে গ্রেফতার করা হয়। মঙ্গলবার রাত থেকে হাসুকে গ্রেফতারের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লেও বুধবার বিকাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল কেউ কোন বক্তব্য দেননি।

তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, রাতেই হাসুকে গ্রেফতার করে বিজিবি। পরে বিজিবি সদস্যরাই তাকে যশোর থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। বিজিবির হেফাজতেই আছেন হাসু। যে কোন সময় পুলিশ প্রধানের কাছে বিজিবির পক্ষ থেকে হাসুকে হস্তান্তর করা হবে। গ্রেফতারের পর স্বীকার না করা প্রসঙ্গে ওই সূত্রটি জানিয়েছে, গ্রেফতারের কথ স্বীকার করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই জিজ্ঞাসাবাদের পরই তাকে মিডিয়ার সামনে হাজির করা হবে।

তবে গতকাল দুপুরে এমপি শামীম ওসমান জানান, হাসু গ্রেফতারের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এর আগে দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভাতেও হাসু গ্রেফতারের বিষয়ে আলোচনা হলেও কারা গ্রেফতার করেছে সে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি। ওই সভা শেষে জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিয়া জানান, হাসু গ্রেফতারের বিষয়টি তাদের জানা নেই এবং আইন-শৃঙ্খলা কমিটিও বিষয়টি জানে না। ওই সভাতে জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘হাসমত আলী হাসু নামে কাউকে যশোর পুলিশের কোনো শাখা গ্রেপ্তার করেনি। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের সঙ্গেও আমার আলাপ হয়েছে। তারাও গ্রেপ্তার করেনি।’

যশোর বিজিবি ২৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান বলেন, ‘হাসু নামে কাউকে তার ব্যাটালিয়ন আটক করেনি।’ বিজিবি সাউথ-ওয়েস্ট রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. হাবিবুল করিম বলেন, ‘আমরা যদি এমন কাউকে আটক করতাম তাহলে আপনাদেরকে ফোন করতে হতো না। আমি নিজে আপনাদেরকে ফোন করে তথ্য দিতাম। কারণ এক ট্রাক অবৈধ মালামাল উদ্ধারের চেয়ে হাসুকে আটক করতে পারা অনেক বেশি কৃতিত্বের।’

কে এই হাসমত আলী হাসু

আমাদের সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নারায়ণগঞ্জের ৭ হত্যা মামলার তিন নাম্বার আসামি হাসমত আলী হাসু। সে এই মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের প্রধান সহযোগী এবং অর্থের যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। হাসু সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিম পাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত দারোগ আলী। ২ মেয়ে ও এক ছেলে আছে তার। হাসু আশির দশকে নজরুলের শ্বশুর শহিদুল ইসলামের সাথে তার ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। শহিদুল ইসলামের সত্ ভাই এই হাসু। তবে তাদের সম্পর্ক বেশীদিন টেকেনি। এরপর নব্বই দশকে নূর হোসেনের সহযোগী হিসাবে কাজ করতে থাকেন হাসু।

নারায়ণগঞ্জের শিমরাইলে অবস্থিত সড়ক ও জনপথের ঢাকা বিভাগীয় অফিসের টেন্ডারবাজির মাধ্যমে শুরু হয় নূর হোসেনের সাথে হাসুর পথ চলা। ১৯৯২ সালে নূর হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তার সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হন হাসু। এরপর থেকে দু’জনেই সওজ’র টেন্ডারবাজি করতে থাকে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে গেলে হাসুও কিছুদিন আত্মপোগনে থাকেন। কিছুদিন পর হাসু এলাকায় এসে সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাকে মেসার্স ভাই ভাই নিটিং নামে একটি গেঞ্জি তৈরির কারখানা চালু করেন। নজরুলের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম জানান, হাসুর একচ্ছত্র টেন্ডারবাজির ক্ষেত্রে নজরুল মাঝে মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াত।

তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করলেন ডিসি

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি না হলেও পুলিশ প্রশাসনের তত্পরতা ও আন্তরিকতাকে ‘সন্তোষজনক’ হিসেবে দেখছে জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটি। গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ওই সভা শেষে দুপুর সোয়া ২টায় কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিয়া সাংবাদিকদের জানান, কমিটির সভায় জেলা পুলিশ সুপার, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে খুনীদের গ্রেপ্তারের অনুরোধ করা হয়েছে। সভার আলোচনায় মনে হয়েছে পুলিশ সঠিকভাবেই এগুচ্ছে। পুলিশের তদন্ত, তত্পরতা ও আন্তরিকতায় কোন অসংগতি নেই বলে মনে হচ্ছে।

সিদ্ধিরগঞ্জে যুবলীগ সভাপতির বাড়িতে অভিযান

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের সভাপতি মতিউর রহমান মতির বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে সিআইডি। মতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন। গতকাল সন্ধ্যায় সিআইডি নারায়ণগঞ্জ জোনের সহকারী পুলিশ সুপার এহসানউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি টিম সিদ্ধিরগঞ্জের আইলপাড়া এলাকাতে মতির ওই বাড়িতে এ অভিযান চালায়। তবে অভিযানের সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। এহসান সাংবাদিকদের জানান, মতিকে আটকের জন্য অভিযানটি চালানো হয়। তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে নূর হোসেনের সেকেন্ড ইন কমান্ড মামুনের শিমরাইলের বাসায় অভিযান চালিয়ে দু’টি পিস্তল, দু’টি ম্যাগজিন ও ৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নূর হোসেনের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ

এই হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেনের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মামুনুর রশিদ মন্ডলের এক আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিন এই আদেশ দেন।

নিজের জীবন নিয়ে শংকিত শামীম ওসমান

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার পর নিজের জীবন নিয়ে এখনো শংকিত এমপি শামীম ওসমান। গতকাল নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় তিনি এই শংকার কথা বলেন। সভা শেষে শামীম ওসমান সাংবাদিকদের বলেন, নজরুলের পরিবারের সূত্র ধরেই বলছি নূর হোসেন টাকা দিয়ে এ হত্যাকান্ডগুলো ঘটিয়েছে। নূর হোসেন সম্পর্কে সংসদে আমি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তব্য দিয়েছিলাম। তখন মন্ত্রী এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আরিফ ২ দিনের রিমান্ডে

আলোচিত সাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের বাড়ি থেকে গ্রেফতারকৃত আরিফুজ্জামান আরিফকে আবারো ২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল বিকালে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত তার ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

র্যাবের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ

এদিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা অপহূত ইসমাইলের সন্ধান দাবিতে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে অপহূতের পরিবার ও এলাকাবাসী। মানববন্ধন চলাকালে অপহূতের ছোট ভাই আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার ভাই অপহরণের সাথে র্যাব-১১ এর সাবেক সিও লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ ও কমান্ডার এম এম রানা জড়িত। এ তিনজন আমার ভাইকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। তারেক সাঈদ র্যাব-১১ এর দুইজন লোকের মাধ্যমে ইসমাইল ভাইয়ের হাতের লেখা চিঠি পাঠায়। তাদের সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমাদের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা দাবি করে। কিছুদিন আগেও আমার ভাই র্যবের কার্যালয়ে ছিল কিন্তু সেভেন মার্ডারের পর তাকে সরিয়ে নিয়েছে। আমরা আমাদের ভাইকে জীবিত অবস্থায় ফেরত চাই।

অপহূতের স্ত্রী জোত্স্না বেগম বলেন, র্যাবের কর্মকর্তারা আমাকে বলেছিল, ২ কোট টাকা দিলে আমার স্বামীকে ছেড়ে দিবে। আরো বলেছে, কোন মিডিয়া বা অন্য কাউকে জানালে আমার স্বামীর লাশও পাবো না, আর আমার ফ্যামিলির সবাইকে মেরে ফেলবে। আমি মহিলা মানুষ, আমাদের জায়গা জমি বিক্রি করে ধার করে এক কোটি টাকার মতো যোগাড় করে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ২ কোটি টাকা না হওয়ার কারণে আমার স্বামীকে ফেরত দেয়নি র্যাব।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here