বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব অসুস্থ রিজভী আহমেদকে দেখতে গতকাল মধ্যরাতে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছুটে যান চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রিজভীকে দেখে গুলশানের বাসায় ফেরার সময় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তারক্ষীদের বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে। এ নিয়ে মধ্যরাতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে নয়াপল্টনে। এদিকে কিছুদিন ধরে দলীয় কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ততার কারণে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাতে অবস্থান করেন রিজভী আহমেদ। ২৫শে অক্টোবর সমাবেশ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঈদের পর থেকেই নয়াপল্টনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে প্রশাসন। গত শুক্রবার থেকে নয়া পল্টনের কার্যালয় পুলিশ অবরুদ্ধ করে রাখে। কোনো নেতা-কর্মীকে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। ফলে রিজভী শুক্রবার থেকেই কার্যালয়ে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় গতকাল বিকালের দিকে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। খবর পেয়ে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে নয়াপল্টনে অবরুদ্ধ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অসুস্থ রিজভীকে দেখতে ছুটে যান খালেদা জিয়া। চেয়ারপারসন নয়াপল্টনের কার্যালয়ে যাচ্ছেন- এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা সেখানে জড়ো হয়। বিরোধী দলীয় নেতা কার্যালয়ে পৌঁছালে নেতা-কর্মীরা শ্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত অবস্থায় খালেদা জিয়া তৃতীয় তলায় রিজভীকে দেখতে যান। চিকিৎসকদের কাছে তার সর্বশেষ শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। তিনি রিজভীর সঙ্গে কথা বলে তাকে সান্ত্বনা দেন। ১০ মিনিট সেখানে অবস্থানের পর ১১টা ১০মিনিটের সময় কার্যালয় থেকে গুলশানের বাসার উদ্দেশ্যে গাড়িতে চড়েন খালেদা জিয়া। কিন্তু খালেদা জিয়ার গাড়ির পেছনে তার নিরাপত্তারক্ষীদের একটি গাড়ি আটকে দেয় পুলিশ। তারা সে গাড়ির ভেতরে বসা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক টুকুকে নেমে আসতে বলেন। এ সময় খালেদা জিয়ার নিরাপত্তারক্ষীরা তার প্রতিবাদ করে গাড়িবহর এগিয়ে নিতে চায়। চালক নূর হোসেন গাড়ির দরজা খুলতে অস্বীকৃতি জানালে মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদীর নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা লাঠি ও রাইফেলের বাট দিয়ে মাইক্রোবাসটির ডানপাশের লুকিং গ্লাস ও জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলে। গাড়িচালকসহ দুই নিরাপত্তারক্ষীকে বেদম পেটাতে থাকে। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়ার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) মজিদ সামনে এগিয়ে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীদের পেটানোর প্রতিবাদ জানিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে চাইলে এডিসি মেহেদী তাকে শার্টের কলার চেপে ধরেন। এ সময় পুলিশ সদস্যদের হাতে কর্নেল (অব.) মজিদ লাঞ্ছিত হন। এক পর্যায়ে পুলিশ গাড়ি থেকে সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে নামিয়ে টেনে হেচড়ে পল্টন থানায় নিয়ে যায়। এতে নয়াপল্টনে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলের সিনিয়র নেতাদের সামনেই এ ঘটনা ঘটে। এর ফলে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর ১৫ মিনিট কার্যালয়ের সামনে সড়কে থেমে ছিল। এ সময় বিরোধী দলীয় নেতার বিশেষ সহকারি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস সেখানে উপস্থিত মতিঝিল জোনের ডিসি আশরাফুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জামানকে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতার গাড়িবহর থেকে এভাবে কৌশল করে একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে আপনারা সঠিক কাজ করেননি। জবাবে ডিসি আশরাফুজ্জামান বলেন, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা (খালেদা জিয়ার নিরাপত্তারক্ষী) কিভাবে ইউনিফর্ম পরা পুলিশের গায়ে হাত তুলেন, তা আমাদের বলতে দুঃখ হয়। এটা তারা ঠিক কাজ করেনি। পরে শিমুল বিশ্বাস ডিসিকে অনুরোধ জানায় আটক টুকুকে যেন ছেড়ে দেয়া হয়। টুকুকে ছেড়ে দেয়া হবে- ডিসি‘র এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে রাত ১১ টা ৩৫ মিনিটে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর নয়াপল্টন কার্যালয় থেকে চলে যায়। এ সময়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর (অব.) শাহজাহান ওমর বীরউত্তম, সাংবাদিক শফিক রেহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লাহ বুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, মজিবুর রহমান সারোয়ার, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এমপি, আবুল খায়ের ভুঁইয়া এমপি, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল, সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল করীম চৌধুরী আবেদ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে পরে মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদি হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা খালেদা জিয়ার গাড়িবহর যখন সাজাচ্ছিলাম, তখন পেছন থেকে একটি গাড়ি আমাদের চাপা দেয়ার চেষ্টা করে। এতে আমিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আমার ডান হাতে এখনো রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ওই গাড়িতে আরোহী ছিলেন সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, আমার উপর কেন এমন আক্রোশ। আমাকে টার্গেট করে কোনো ষড়যন্ত্রে চাপা দিতে চেয়েছে। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের গাড়িচাপা দেয়ার চেষ্টা করায় তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য টুকুকে আটক করা হয়েছে।’ গাড়ি চাপা দিলে গাড়ি চালককে আটক না করে আরোহীকে আটক করা হলো কেনো প্রশ্ন করা হলে মেহেদি বলেন, ‘চালক পালিয়ে গেছে।’ চালক ধরে পেটানোর পর কেন ছেড়ে দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে এডিসি মেহেদী বলেন, ‘ধরা হয়েছিল, কিন্তু চালক পালিয়ে গেছে।’ খালেদা জিয়া নয়াপল্টন থেকে চলে যাবার পর সেখানে পুলিশ ও র‌্যাবের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। এদিকে রিজভী আহমেদের চিকিৎসক ডা. শফিউল্লাহ জানান, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ রিজভী আহমদের মাঝে মধ্যে পোস্টঅপারেটিভ সমস্যা দেখা দেয়। এ সময় তার তীব্র পেট ব্যাথা ও বমি হয়। এখন তার চিকিৎসা চলছে। ওদিকে রিজভি আহমেদকে হাসপাতালে নিতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এম্বুলেন্স নেয়া হলেও সংঘটিত পরিস্থিতির কারণে তাকে কার্যালয়েই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
বিএনপি সংসদীয় দলের বৈঠক আজ
দলীয় এমপিদের এক বৈঠক ডেকেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। আজ রাত আটটায় চেুয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপিদলীয় এমপিদের বৈঠক ডেকেছেন খালেদা জিয়া। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার প্রস্তাবের পরই এ বৈঠক ডাকলেন বিরোধীদলীয় নেতা।tuku

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here