vote bankদেশের উত্তরবঙ্গের তিনটি জেলায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রধান কারণ- তাদেরকে ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা। সম্প্রতি সাম্প্রদায়িক হামলায় আক্রান্ত গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, দিনাজপুরের কর্ণাই এবং ঠাকুরগাঁয়ের গড়েয়া পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ শেষে এ কারণ চিহ্নিত করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। আজ বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রকাশ করেন মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।

গত ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চ ঐ এলাকাগুলো পরিদর্শন করে এবং দ্বিতীয় রোড মার্চের অংশ হিসেবে সমাবেশ-পথসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

রিপোর্টে বলা হয়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, দিনাজপুরের কর্ণাই এবং ঠাকুরগাঁয়ের গড়েয়ায়-এই তিনটি এলাকাতেই মূলত ভোট প্রদানকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদেরকে ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনার মানসিকতাই এই হামলার পেছনের একটি প্রধান কারণ। বিশেষ করে জামায়াত-শিবির এবং তাদের অনুসারীদের বদ্ধমূল ধারণা, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ঐতিহ্যগতভাবেই তাদেরকে ভোট দেয় না। তাই দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর তাদের দীর্ঘদিনের আক্রোশ সময় পেলেই প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের মতোই ২০১৩ সালের নির্বাচনের পরেও জামায়াত-শিবির গোষ্ঠী এই নৃশংস হামলা পরিচালনা করে।

পলাশবাড়িতে হামলা-নির্যাতনের ঘটনায় সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়, দেশের অন্যান্য স্থানের মতোই এখানেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস প্রতিরোধে প্রশাসনের নজিরবিহীন ব্যর্থতা ছিল। আক্রান্তরা অনেকবার অবহিত করলেও প্রশাসন সেখানে উপস্থিত হয়নি। এমনকি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও এখানে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানোর পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। হিন্দু সমপ্রদায়ের পাশাপাশি এখানে নির্বাচনের পক্ষের দল, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও তাণ্ডবের শিকার হয়েছেন। ঘরে ঘরে ঢুকে আগুন দেয়া হয়েছে। অনেক বাড়িতে ঢুকে পবিত্র কোরআন শরীফসহ অনেক হাদিসের বই পুড়িয়েছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।

দিনাজপুরের তেলিপাড়া ও কর্ণাইয়ে হামলা সম্পর্কে বলা হয়, নির্বাচনের দিন সকাল ৭টায় পার্শ্ববর্তী মহাদেবপুরের নির্বাচন প্রতিহতের ডাক দেয়া রাজনৈতিক দলের কর্মীরা তেলীপাড়ায় উপস্থিত হয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য হুমকি দেয়। সকাল সাড়ে১০ টার দিকে একই এলাকার ঐ সন্ত্রাসীরা তেলীপাড়ায় গিয়ে ভোটকেন্দ্রে না আসার জন্য বাধা দেয় এবং যারা ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরে গেছে তাদের সনাক্ত করতে প্রত্যেকের হাত দেখে দেখে অমোচনীয় কালি আছে কিনা সেটি পরীক্ষা করতে থাকে এবং নির্যাতন চালাতে থাকে। তেলিপাড়ার সবগুলো রাস্তা আটকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয় গোটা গ্রাম। ভোট দিয়ে ফেরার পথে প্রত্যেক মানুষ এখানে হামলার শিকার হন। জনগণ প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলেও তাদের সহায়তায় কেউই এগিয়ে আসেনি। এমনকি ভোটকেন্দ্রে আটকাপড়া নারী ভোটাররা নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করলেও তাদের বাড়িতে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা হয়নি। এদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভোটকেন্দ্র কর্নাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা শুরু হওয়ার পর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানালেও তাত্ক্ষণিক কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। মহাদেবপুর গ্রামের সন্ত্রাসীদের সাথে কাটাপাড়া, সাহাপাড়া, ডুমুরতলীর সন্ত্রাসীরা যুক্ত হয়ে দফায় দফায় মারাত্মক হামলা, ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ চালায়। অপরদিকে নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর আরেকদল সন্ত্রাসী দুপুর দেড়টা থেকে ২টা পর্যন্ত তেলিপাড়ায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজ শেষ করে ভোটকেন্দ্রের মাঠে জমা হয়। তখন স্থানীয় অধিবাসীরা সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করলে তারা আরো শক্তি বৃদ্ধি করে ভোটকেন্দ্রের পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম দিক থেকে হামলা চালিয়ে কর্নাই বাজারে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালায় এবং নারী-শিশুসহ সকলের উপর নির্যাতন চালায়।

ঠাকুরগাঁয়ের গড়েয়ায় হামলা সম্পর্কে রিপোর্টে বলা হয়, স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী তরুণেরা প্রাথমিক প্রতিরোধও গড়ে তুলেছিলো গড়েয়ায়। হামলায় নেতৃত্ব দেয়া অন্তত ২জনকে হাতেনাতে ধরেও ফেলেছিলো তারা। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের সমঝোতার আহবান এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে সন্ত্রাসীদের ছাড়িয়ে নেয়ার পর আরও দূরদূরান্ত থেকে সন্ত্রাসী এনে গড়েয়ায় হামলা করা হয়। এই হামলায় আক্রান্তরা খালেক নামে স্থানীয় ইউপি সদস্যের নেতৃত্ব দেবার কথা সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন।

নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিরোধে দায়-দায়িত্ব পালন ও ব্যর্থতার বড় দায় নির্বাচনের কমিশনের বলে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, একটি উত্তেজনাকর ও সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের নিরাপত্তায় যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার ছিলো, সেরকম কোনো ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন নেয়নি। হামলার জন্য দায়ী নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দেয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর স্থানীয় নেতাকর্মীরা। হামলা রোধে নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রার্থী এবং তাঁদের সমর্থকরা সম্পূর্ন ব্যর্থ।

ভবিষ্যতে এ ধরণের হামলা প্রতিরোধে ও ঝুকিপূর্ণদের রক্ষায় ছয়টি প্রস্তাবনাও করা হয় রিপোর্টে। একইসাথে সামপ্রদায়িক ও সামাজিক সন্ত্রাস রোধে আলাদা আইন তৈরি করা, দায়ী ব্যক্তি ও গোষ্ঠিকে গ্রেফতার করে অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইবুনালে দ্রুত তাদের বিচার এবং হামলার শিকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষতি নিরূপন করে তাঁদেরকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে সরকারের কাছে দাবি জানায় গণজাগরণ মঞ্চ।

উল্লেখ্য গত ১০ ও ১১ জানুয়ারি শাহবাগ থেকে যশোর মালোপাড়া পর্যন্ত প্রথম রোডমার্চ করে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক-কর্মীরা।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here