প্newsরধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেমন জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন, তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, পুত্র তারেক ও তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা জড়িত ছিলেন। জিয়া পরিবারকে খুনি পরিবার হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এই খুনি পরিবারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। বাংলার মাটিতে কোন খুনি-সন্ত্রাসীর ঠাঁই হবে না।

 

ভয়াল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দশম বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সেদিন গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। এ হামলায় আমার কোনভাবেই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছেন। আবেগ জড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, বারবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ’র রহমতে এবং জনগণের ভালবাসায় আমি রক্ষা পেয়েছি। মৃত্যুকে আমি ভয় করি না। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করবো না। কারণ জীবন দেয়া ও নেয়ার মালিক আল্লাহ।

 

গ্রেনেড হামলায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে যখন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হন, তখন হাজার হাজার নেতাকর্মীর শ্লোগানে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠে। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে এসেই প্রথমে সেখানে স্থাপিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর দলীয় সভানেত্রী হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষে এবং পরে ১৪ দলের নেতাদের নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত গ্রেনেড হামলায় নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং আহতদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। তারা শেখ হাসিনাকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সেখানে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীও তাঁর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। পরে প্রধানমন্ত্রী আলোচনা সভায় অংশ নেন।

 

প্রধানমন্ত্রী ২১ আগস্টের সকল শহীদের রূহের মাগফেরাত এবং আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করে বলেন, ভাবতে কষ্ট লাগে আইভি রহমানসহ ২৪ জনের প্রাণ গেল। আমার জীবন নিয়েও যদি তাঁরা বেঁচে থাকতেন তবে ভাল লাগতো। যতদিন বেঁচে আছি জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাব। শেখ হাসিনা বলেন, এই হামলার আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন আওয়ামী লীগ আগামী একশ’ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আমি প্রধানমন্ত্রী কেন, কোনদিন বিরোধী দলীয় নেত্রীও হতে পারব না। কোন পরিকল্পনা থেকে তিনি এই ভবিষ্যত্ বাণী করেছিলেন? এরপরই তো গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, তারেক রহমান ধানমন্ডিতে শ্বশুর বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু গ্রেনেড হামলার আগেই তিনি কেন ধানমন্ডির ওই বাসা ছেড়ে ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। এই হামলার সঙ্গে খালেদা জিয়া, তাঁর পুত্র ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা যে জড়িত ছিলেন তা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

 

গ্রেনেড হামলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির মিছিল করতে গিয়ে আমরাই সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হয়েছি। একের পর এক ১৩টি গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মনে হয়েছে যেন কিয়ামত হচ্ছে। হানিফ ভাই (প্রয়াত সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ), মায়া (ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম) ও মামুন (তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা অফিসার) মানবঢাল রচনা করে আমাকে রক্ষা করেছেন। শুধু গ্রেনেডই নয়, আমাকে হত্যার জন্য আমার গাড়ি লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলিও ছোঁড়া হয়। সেই গুলিতে আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সদস্য মাহাবুব গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হামলার পর তত্কালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার উদ্ধার তো দূরের কথা, উল্টো উদ্ধার করতে আসা আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। সকল আলামত ধুয়েমুছে নষ্ট করে দিয়েছে। এমনকি আমরা সংসদে কথা বলতে গেলেও আমাদের কথা বলতে দেয়া হয়নি। ওই বিএনপি নেত্রীসহ অন্যরা বলেছে, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে ১৩টি গ্রেনেড নিয়ে গিয়ে হামলা করেছি! শুধু মিথ্যাচারই নয়, হামলার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে নানা অপকর্ম করেছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে আজ জাতির সামনে স্পষ্ট হয়েছে এবং তদন্তেও বেরিয়ে এসেছে যে এই হামলার সঙ্গে খালেদা জিয়া, তার পুত্র তারেক রহমান ও তাঁর মন্ত্রীসভার অনেক সদস্যই জড়িত।

 

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়া যে জড়িত ছিল, তা আত্মস্বীকৃত খুনী ফারুক-রশিদ বিবিসিতে সাক্ষাত্কারে বলেছে। ওই দুই খুনী স্পষ্ট করে বলেছে যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনার কথা তারা জিয়াকে জানিয়েছেন। জিয়া তখন তাদের উত্সাহ দিয়ে বলেছে, সরাসরি নিজে থাকতে না পারলেও পরিকল্পনা সফল হলে তাদের (ফারুক-রশিদ) সব ধরনের সহযোগিতা করবেন। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতা দখলকারীরা বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দিয়ে এদেশকে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ বানাতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণের প্রবল প্রতিবাদের মুখে তারা তা করতে পারেনি।

 

গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বানচাল করতে আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াতের মানুষ হত্যার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে, নিজ দলের এতোবড় ক্ষতি করে তারা মানুষ নয়, মানুষ নামের কলঙ্ক। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এই অপশক্তিরা দেশকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। শত বাধা উপেক্ষা করে আমরা গণতন্ত্রকে রক্ষা করেছি। বাংলাদেশ আজ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের এই অগ্রযাত্রা ঠেকানোর শক্তি কারোর নেই। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবোই ইনশাল্লাহ।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তির পদলেহনকারী ও তোষামদকারীরা সুযোগ পেলেই বাঙালি জাতির ওপর আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশ যাতে এগিয়ে যেতে না পারে সেজন্য এখনও চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। পরাজিত শক্তির মদদদাতা, দোসর ও খুনীদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

 

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দসহ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

 

আলোচনা সভার শুরুতেই নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন ওলামা লীগের সভাপতি মাওলানা ইলিয়াস হোসেন বিন হেলালী। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে সবাই এক মিনিট নিরবতা পালন করেন। বক্তব্য শেষে সন্ধ্যা ৬টায় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ত্যাগ করেন। এরপর সর্বস্তরের জনগণ রাত অবধি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here