বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলার রায় ৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হবে। মামলায় খালেদা জিয়া ছাড়াও তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক মূখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমদ আসামি হিসাবে রয়েছেন।

সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহন, আসামিদের আত্নপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামান গতকাল বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার জন্য এই দিন ধার্য করে দেন। রায়ের দিন ধার্যের সময় খালেদা জিয়া আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এরপরই ৩টা ২৭ মিনিটে আদালত কক্ষ ত্যাগ করেন তিনি।

রায়ের দিন ধার্যের মধ্য দিয়ে প্রায় দশ বছর ধরে চলা এ মামলার বিচার কার্যক্রম এখন সমাপ্তির পথে। বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই মামলা দায়ের করে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হলেও এই প্রথম কোন মামলায় তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করল আদালত।

এর আগে অর্থ পাঁচারের একটি মামলায় তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদন্ড দিয়েছে হাইকোর্ট। মামলায় তিনি প্রথমে বিচারিক আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন।

২০০৮ সালের ৩ জুলাই নগরীর রমনা থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলা দায়ের করে দুদক। এই মামলার অভিযোগে বলা হয়, এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে পাঠানো ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ক্ষমতার অপব্যহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাত্ করেছেন আসামিরা। ২০০৯ সালের ৫ আগষ্ট খালেদা জিয়াসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অরফানেজ মামলা বিচারাধীন থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে ২০১১ সালের ৮ আগষ্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাষ্ট মামলা দায়ের করে দুদক। এই মামলায় খালেদা জিয়াসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার সকল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক বাসুদেব রায়। দন্ডবিধির ৪০৯, ১০৯ ও দুদক আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠনের পরই শুরু হয় দুটি মামলার সাক্ষ্য গ্রহন। সাক্ষ্য গ্রহন শেষে খালেদা জিয়া আদালতে আত্নপক্ষ সমর্থণে লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন। এরপরই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়।

যুক্তির্ক উপস্থানকালে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল এই মামলায় খালেদা জিয়াসহ সকল আসামির সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজা প্রদানের আবেদন জানান। তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অর্থ আত্নসাতের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। অপরদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যুক্তিতর্ক উপস্থানকালে আদালতে বলেছেন, তার রাজনৈতিক জীবনকে বাধাগ্রস্থ করতেই জাল নথি সৃজন করে এ ধরনের মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে। খালেদা জিয়াকে ‘চোর’ অপবাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। আমরা যা-ই বলি না কেন, সাক্ষ্য-প্রমাণে যা কিছুই থাকুক না কেন এ মামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে যে কোনভাবে বলতেই হবে ‘কেষ্ট বেটাই চোর’।

আদালতের কার্যক্রম

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে আদালতে হাজির হন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এর আগেই শুরু হয় আদালতের কার্যক্রম। শুরুতে মামলার আসামি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমদ ও কাজী সালিমুল হক কামালের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী মো. মিজানুর রহমান ও মো. আহসানউল্লাহ। এদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আইনগত পয়েন্টে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন মোশাররফ হোসেন কাজল। এরপর তার বক্তব্যের জবাব দেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান। এরপরই আদালত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে দেন। এ সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবী মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এজে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, মাহবুবউদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, এম আমিনুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শুনানি ২৩৬ কার্য দিবস

২৩৬ কার্যদিবস এই মামলার বিচার কার্যক্রম চলে। এর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষে ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহন করেছে আদালত। ১৬ কার্যদিবস ধরে চলেছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিরা আত্নপক্ষ সমর্থনে ২৮ কার্যদিবস বক্তব্য রেখেছেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন।

বিচারক পরিবর্তন একাধিকবার

মামলার শুনানিকালে একাধিকবার বিচারক পরিবর্তন হয়েছে। আসামি পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক পরিবর্তন করা হয়। দুদক কৌসুলিরা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৫ জন বিচারক পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এই মামলার শুনানি শেষ করেন। এর আগে খালেদা জিয়ার অভিযোগ গঠন ও আবেদন গ্রহন না করাকে কেন্দ্র করেই বিচারক বাসুদেব রায়, মোজাম্মেল হোসেন, আবু আহম্মেদ জমাদার, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লাকে পরিবর্তন করা হয়। এসব বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানান খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ড. মো. আখতারুজ্জামানকে পরিবর্তনের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেন খালেদা জিয়া। কিন্তু ওই আবেদন নাকচ হয়ে যায়। যা আপিল বিভাগ বহাল রাখে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

এ মামলায় ধার্যকৃত দিনে হাজির না হওয়ায় দু’বার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। কিন্তু ওই পরোয়ানা তামিল হয়নি। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়া আত্নসমর্পণ করেন এবং আদালত তাকে জামিন দেয়।

চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা

চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আত্নপক্ষ সমর্থনে ইতপূর্বে লিখিত বক্তব্য দাখিল করেছেন খালেদা জিয়া। গতকাল বিচারক আগামী ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি এবং পহেলা ফেব্রুয়ারি যুক্তির্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রেখেছেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলেই মামলাটি রায়ের জন্য দিন ধার্য করবে আদালত।

শেয়ার করুন
  • 34
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here