pmnews

সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা দেশে ভয়াবহ ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোয়েন্দা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এসব অপরাধীর বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে বোমা প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী, আদেশ দাতা ও অর্থের জোগান দাতাদের বিচার কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া প্রয়োজন—বলেন প্রধানমন্ত্রী।

গতকাল রবিবার সচিবালয়ে আইন, বিচার ও সংসদ  বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনাকালে  মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, আইন  সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক দুলাল, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিভাগের সচিব মোহাম্মাদ শহিদুল হক বক্তব্য দেন। অন্যান্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব  আবুল কালাম আজাদসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি’র চলমান কর্মকাণ্ডকে ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের এই গোলযোগ স্পষ্টত বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। যদিও এই অশুভ তত্পরতা থেকে তারা কিছুই অর্জন করবে না।

তিনি বলেন, মানুষ যাতে বিচার পায়, শান্তিতে বাস করতে পারে এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতার সঙ্গে এগিয়ে যায়— এ জন্য বর্তমান সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী একটি শক্তিশালী ও কার্যকর বিচার প্রক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পরামর্শ দেয়া ও একত্রে কাজ করার জন্য কর্মকর্তাদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, অতীতে তার সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করেছে এবং আগামীতে এ প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হয়েছিলাম দেশের উন্নয়নটা দ্রুত করতে। সেখানে প্রতিশোধমূলক মনোভাব নিয়ে আমরা তাকাইনি বলেই হয়ত অনেকে রেহাই পেয়ে গেছে, যার জন্য আজ বাড়তে পেরেছে। এর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা আমাদের নিতেই হবে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে জামায়াতের তাণ্ডব এবং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংস আন্দোলনের পরেও ‘দক্ষতার’ সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা এসময় তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গ

কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে আইন অনুযায়ী একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা এভাবে আমাদের মা-বোনদের হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়েছে, পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে, এদের বিচার যদি না হয়, সেটা হবে আমাদের জন্য কলঙ্ক। এদের বিচার হলে আমি মনে করি— জাতি অভিশাপমুক্ত হবে, দেশ অভিশাপমুক্ত হবে।

নিউজিল্যান্ড সফর বাতিল

নিউজিল্যান্ড যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী রাজনৈতিক জোটের অব্যাহত অবরোধ ও হরতাল এবং অবনতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন নিউজিল্যান্ড সফর বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে আগামী ১১ থেকে ১৪ মার্চ নিউজিল্যান্ড সফরের কর্মসূচি ছিল প্রধানমন্ত্রীর। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতি নেয়া হয়।

সংবিধান লংঘন করে আর কেউ ক্ষমতায় আসবে না

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংবিধান লংঘন করে কেউ ক্ষমতায় এলে সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট) ব্যবস্থা রয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান রাখা হয়েছে। এ কারণে কেউ সংবিধান লংঘন করে ক্ষমতা দখল করতে আসবে না। এটা জেনেও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কেন উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে আছেন? কোন বিদেশি প্রভু অথবা উত্তরপাড়ার কেউ খালেদা জিয়াকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে না। অবরোধ-হরতাল নামে সহিংসতা চালিয়ে অসাংবিধানিক কোনো শক্তিকে ক্ষমতায় আনা এখন আর যাবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসম্পৃক্ততা হারিয়ে খালেদা জিয়া পাক হানাদারবাহিনীর মতো গণহত্যা শুরু করেছেন। উনি একদিকে একাত্তরের পরাজিত শক্তি পাকিস্তানের আইএসআইয়ের এজেন্ট হয়ে কাজ করছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’র (ইসলামিক স্টেট) পথ ধরে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করছেন। উনি দেশকে দোজখখানা বানাতে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করছেন কীসের আশায়? হরতাল-অবরোধের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের সহিংসতার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে  ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

গতকাল রবিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নেত্রী (খালেদা জিয়া) মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে ‘উত্তরপাড়া ও বিদেশি প্রভুদের’ দিকে চেয়ে থাকেন। কখন তারা তাকে ক্ষমতায় নিয়ে গিয়ে বসাবেন! এমন নানা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে বসে আছেন। কিন্তু বিএনপি নেত্রীর সেই স্বপ্ন কোনদিন পূরণ হবে না। উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে কোন লাভ নেই। উনি যাদের নিয়ে ভাবেন তারাও জানে এভাবে ক্ষমতায় এলে কি পরিণতি হয়। আগুনে কেউ পা দিতে আসবে না। অতীতে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল তাদেরকেও খারাপ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। জিয়া-এরশাদের পরিণতি কী হয়েছে? অনেককে দেশ ছেড়ে (মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন) যেতে হয়েছে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত নাগরিক কমিটির প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুশীলদের নিয়ে ১৭ জনের একটি কমিটির তালিকা দেখলাম। যাদের অধিকাংশই সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। কর্মরত থাকা অবস্থায় অনেককেই পদোন্নতির জন্য, মুখ্য সচিবসহ নানা পদের জন্য তদবির করতে দেখেছি। সরকারি চাকরি শেষেই তারা সুশীল হয়ে ছবক দেন। কিন্তু দেশের মানুষ আজ খুবই সচেতন। কেউ মিথ্যা কথা বলে তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। আর সুদখোর, ঘুষখোর ও চাটুকারদের দিয়ে কখনো কোন দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। তাছাড়া তারা (সুশীল সমাজ) ভুলে গেছে- সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।

ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনারা যখন বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন তখন মানুষ ভেবেছিল তারা খালেদা জিয়াকে হরতাল-অবরোধের নামে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা বন্ধ করতে বলবেন। এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করতে বলবেন।

 তাঁরা ন্যায়-নীতির কথা বলেন, টকশোতে টেলিভিশন ফাটিয়ে ফেলেন, কিন্তু খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এসব কোন কথাই তাঁরা বলেননি। হয়তো তাঁরা মনে করছেন, এভাবে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চললে কিছু একটা ঘটবে, অনেকের গাড়িতে পতাকা উড়তেও পারে। কিন্তু সেই আশাও কোনদিন পূরণ হবে না।

শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নেত্রী গণতন্ত্রের নামে দেশে জঙ্গি আর সন্ত্রাসতন্ত্র চালু করেছেন। নির্বাচনে না এসে নিজে ভুল করে এখন উনি জনগণের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের দেশের জনগণের পরিবর্তে উনি পরদেশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর এত আশা সেই দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রীও তাঁকে নাশকতা-সহিংসতা ও মানুষ হত্যা বন্ধ করতে বলেছেন।

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, খালেদা জিয়া শহীদ মিনারে বিশ্বাস করেন না বলেই শ্রদ্ধা জানাতে যাননি।

বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দেশ, দেশের জনগণ ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের নেত্রী হয়ে খালেদা জিয়া ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। তার পাশে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও আজ নেই।

খালেদা জিয়াকে ‘ফোর টুয়েন্টি নেত্রী’ আখ্যায়িত করে মতিয়া চৌধুরী বলেন, শুধু দেশের মানুষের সঙ্গেই নয়, বিদেশিদের সঙ্গেও বিএনপি নেত্রী ফোর টুয়েন্টিগিরি করেছেন। পৃথিবীর কোথাও জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ কোনদিন জিততে পারেনি, বাংলাদেশেও পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাংবাদিক রাহাত খান, এমএ আজিজ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, আহমদ হোসেন, কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, কামরুল ইসলাম ও আমিনুল ইসলাম আমিন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here