প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা দিলেন বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে উপস্থাপিত প্রস্তাবে তিনি বলেছেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়কের ২০জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে ১০ জনকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হবে। এর মধ্যে ৫জনের নাম প্রস্তাব করবে ক্ষমতাসীন দল, অবশিষ্ট ৫জনের নাম প্রস্তাব করবে বিরোধী দল। আর সরকার ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন সম্মানিত নাগরিককে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নির্ধারণেরও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। গতকাল সোমবার রাজধানীর ওয়েষ্টিন হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাব তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, সংসদ যেভাবে রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করে, একইভাবে বর্তমান সংসদ ভেঙ্গে যাবার আগে প্রয়োজনে ঐ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও নির্বাচিত করে দিতে পারে। সাংবিধানিকভাবে এই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনকালীন যে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটিরই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল এই সংবাদ সম্মেলন করেন খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও প্রস্তাবের জবাবের পাশাপাশি বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, সেটিরও একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা দেন। বললেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও সত্ লোকদের নিয়ে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা হবে। দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস দমনে প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়ে একযোগে কাজ করারও প্রত্যয় ঘোষণা করেন। সংবাদ সম্মেলনে ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা, বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি ও কয়েকজন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।

প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণভিত্তিক দুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই দুটি সরকারের উপদেষ্টারা তাদের নিরপেক্ষতার জন্য সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছিলেন। ঐ দুটি নির্বাচনে একবার আওয়ামী লীগ ও একবার বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। আমি আশা করি- শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী আমার প্রস্তাব গ্রহণ করবেন। বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, আমি আশা করি-বিপর্যয় মোকাবেলায় সক্ষম এ জাতি অচিরেই এ রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে। সেই লক্ষ্যেই আমি এ প্রস্তাব তুলে ধরলাম। আমরা সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই। স্বৈরশাসন নয়, গণতন্ত্র চাই।

জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও প্রস্তাব সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) কেবল নির্বাচনের তারিখ নিয়ে বিরোধীদলের পরামর্শ চেয়েছেন। তার এ বক্তব্যে জাতি হতাশ হয়েছে। আমি এখনো মনে করি, আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করা দরকার। সেটা যত দ্রুত হয়, ততই মঙ্গল। সেজন্যই আমি বিএনপি ও ১৮ দলের পক্ষ থেকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে উপস্থাপন করলাম। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে দ্রুত আলোচনার কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, সারা দেশ এখন পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ। গণতান্ত্রিক ধারাকে অক্ষুণ্ন রেখে শান্তিপূর্ণপন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে হলে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সকল দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যই জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আমরা তুলেছি। সকল বিরোধীদল ও দেশের জনগণের বিপুল সমর্থনে এই দাবি আজ জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে যা-কিছু বলেছেন, তা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেননা এতে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন ও সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তিনি সংবিধানের যে দোহাই দিচ্ছেন, তা তারা নিজেরাই যথেচ্ছ রদবদল করে সংকট সৃষ্টি করেছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করেছেন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের সুযোগ তৈরি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তার প্রস্তাবে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের যে অস্পষ্ট ধারণা তুলে ধরেছেন তাতে সেই অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান কে হবেন- তা খোলাসা করেননি। এতে নাগরিকদের মধ্যে এই সংশয় রয়ে গেছে যে, তিনি সংসদ বহাল ও নিজের হাতে ক্ষমতা ও প্রশাসন কুক্ষিগত রেখে বিরোধী দলকে এক অসম প্রতিযোগিতায় আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তিনি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের গণদাবি সম্পর্কে কোনো আলোচনার অবকাশ না রেখে একতরফাভাবে শুধুমাত্র নিজের সুবিধা অনুযায়ী একটি প্রস্তাব তুলেছেন।

তিনি বলেন, পরিবর্তনের কথা কেবল মুখে বলাই যথেষ্ট নয়। কেননা এদেশের জনগণ অতীতেও পরিবর্তনের অঙ্গীকার রাজনীতিকদের কণ্ঠে শুনেছে। সে কারণে আজ আমি খুব স্পষ্ট করে একটি কথা বলে এই পরিবর্তনের সূত্রপাত ঘটাতে চাই। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছি যে, যারা আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতে নানা রকম অন্যায়-অবিচার করেছেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন, আমি তাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করছি। আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম। সরকারে গেলেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেবো না। আমি কথা দিচ্ছি, আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল ও অধিক নিরাপদ ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করার কাজে। প্রতিশোধ নেয়ার, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মতো কোনো ইচ্ছা ও সময় আমার নেই। আমি আশা করি, একটি সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়তে, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, শান্তিময় ও নিরাপদ আবাসভূমি গড়ে তুলতে আগামী দিনে আমরা সকলে মিলে একসাথে কাজ করবো। আমি তাদের সকল ইতিবাচক ধ্যান-ধারণা, পরামর্শ এবং অবদান ও অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাবো।

অতীতে ক্ষমতায় থাকাকালে ভুল-ত্রুটির কথা স্বীকার করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মানুষ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। একথা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, অতীতে আমাদেরও ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। তবে একইসঙ্গে আমি বলতে চাই যে, আমরা ঐসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। আগামীতে একটি উজ্জ্বল, অধিক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আমরা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি সেই প্রবচনের সঙ্গে একমত যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাই আমরা অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করবো না।

বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে প্রতিবেশী দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আজকের দুনিয়া একটি বিশ্বসমাজে পরিণত হয়েছে। কোনো দেশ ও অঞ্চলই এখন আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকতে পারে না। তাই আমাদেরকে বিশ্বসমাজের শরিক হিসেবে ভূমিকা ও অবদান রাখতে হবে। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হলে দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হবে। আর দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল হলে বিশ্বসমাজে তার প্রভাব পড়বে। সে কারণেই আমরা এমন নীতি গ্রহণ করবো যা দেশের এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার করবে। শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ এক বিশ্বসমাজ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ও আমাদের প্রতিবেশী সকল দেশ যাতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে- আগামীতে আমাদের সরকার সে ভাবেই কাজ করবে। তিনি বলেন, বিশ্বের প্রায় ছয় ভাগের একভাগ মানুষ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বাস করে। ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে প্রবহমান নদ-নদী, ইতিহাস, অভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা এবং পরিচিতিবোধ আমাদেরকে সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদা বজায় রেখে আন্তরিক সংলাপ ও অব্যাহত মত বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যকার বিরাজমান সমস্যাবলী নিরসন করতে পারি। তবে সমস্যা নিরসনের জন্য কেবল সরকারের সঙ্গে সরকারের আলোচনাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলা এবং এক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক স্থাপনকে আমরা গুরুত্ব দেব। আমরা যদি আগামীতে সরকারে যেতে পারি তাহলে আমরা কোনো দলের সরকার হবার বদলে জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি হবো। আমাদের আগামী প্রজন্ম যাতে একটি উন্নত জীবনমান পায় আমরা সে ধরনের নীতিমালার বাস্তবায়ন করবো। আমরা পশ্চাত্মুখী হবো না। আমাদের দৃষ্টি হবে সম্মুখপ্রসারী। আমরা এমন সব নীতিমালা গ্রহণ করবো যাতে সমাজের সকল স্তরে ও খাতে টেকসই উন্নয়ন ঘটতে পারে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করে—এই অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে অতীতে ফিরে গিয়ে আমাদের সরকারের আমল নিয়ে অসত্য বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। আমাদের সময়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তারের অভিযোগ তিনি তুলেছেন। কিন্তু এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিস্তার আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলেই ঘটেছিল। যশোরে উদীচীর গানের আসরে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে, পল্টনে সিপিবির জনসভাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে এবং খুলনায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে, বানিয়ারচরে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের গীর্জায় জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলায় বহু নিরপরাধ মানুষ জীবন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজের জেলা গোপালগঞ্জে বিরাট আকৃতির শক্তিশালী বোমা পাওয়ার ঘটনা তার আমলেই ঘটেছিল। কোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি। বরং প্রকৃত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের আড়াল করে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ও দায়িত্বশীল নেতাদের গ্রেফতার করে হেনস্তা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে সৃষ্ট এই জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস আমাদের সরকারের আমলেও অব্যাহত ছিল। তবে আমরা জঙ্গিদের সনাক্ত করতে সক্ষম হই। তাদের সংগঠন ও তত্পরতা নিষিদ্ধ করি। শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের গ্রেফতার ও তাদের বিচারের ব্যবস্থা করি। আমাদের সরকারের আমলেই শীর্ষ জঙ্গিদের বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয়, পরে তা কার্যকর করা হয়েছে। আমাদের সর্বাত্মক প্রয়াসে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব হয়। আমরা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করি। এই বাহিনী ব্যাপক সাফল্য ও সুনাম অর্জন করে। র্যাবকে আমরা কখনো বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনের কাজে অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করিনি। আমরা এই দমন অভিযানের পাশাপাশি মুসলিম প্রধান এই দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনমতকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম সমাজকেও কাজে লাগাই। এতে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ মানুষেরাও সোচ্চার হয়ে ওঠেন। অপর পক্ষে শান্তিপ্রিয় ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জঙ্গিবাদকে একাকার করে দেখার ভুল নীতি গ্রহণের কারণে আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে সমাজে উত্তেজনা ও সংঘাত বেড়েছে। এতে করে জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমাদের সরকারের আমলে আমরাই এর সূচনা করেছি। আগামীতে এ লড়াই কেবল অব্যাহতই থাকবে না, সন্ত্রাস বিরোধী আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে মিলে এই সহযোগিতা আরো বাড়াবার উদ্যোগ আমরা নেব। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ শান্তি ও স্থিতিশীলতার শত্রু। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে ব্যাহত করে। সর্বোপরি, এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ আমাদের জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম পবিত্র ইসলাম ও মুসলমানদের সুনাম ক্ষুণ্ন করে। আন্তঃদেশীয় এই অপরাধ বাংলাদেশের শুধু নয়, বিশ্বের নাগরিকদের জীবনমানকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। বাংলাদেশের মাটিকে দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অথবা অন্য কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তত্পরতায় কখনো ব্যবহার করতে না দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সকল প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ।

সরকারে যেতে পারলে সকল ধর্মের মানুষের জীবনযাপন নিরাপদ করার অঙ্গীকার করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, বাংলাদেশি হিসেবে আমরা নানা গৌরবগাঁথায় পরিপূর্ণ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় এক মহান জাতি। সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে আমাদের সকলের পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। এদেশের প্রতিটি নাগরিকের সংবিধান ও আইনের আওতায় সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পাবার অধিকার সম্পূর্ণ সমান। আমাদের উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে যারা সংখ্যায় কম, সেই নাগরিকরা অনেক সময় অরক্ষিত হয়ে পড়েন। কখনো কখনো তারা নিরাপত্তা-ঝুঁকিতে থাকেন। আইনের আওতায় তারা যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পান না। তাদের বাড়ি-ঘর ও উপসনালয়ে হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। তাদের সম্পদ দখল করা হয়। তারা নিজেরাও আক্রান্ত ও হেনস্তার শিকার হন। এটা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। আমরা সরকারে গেলে সকল নাগরিকের সমনিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। কোনো সম্প্রদায়ের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও সম্ভ্রমের ওপর হামলা হলে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনামলে এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। সাম্প্রতিককালে বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ওপর আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। বর্তমান সরকার তা করেনি। আমরা সরকারে গেলে এ জাতীয় সকল ঘটনার ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তিবিধান নিশ্চিত করা হবে। আমি বহুবার বলেছি, আজ আবারো বলছি, আমরা বাংলাদেশের কোনো নাগরিক কিংবা গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু বলে বিবেচনা করি না। আমাদের সকলের অভিন্ন পরিচয়—আমরা বাংলাদেশি।

জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণেও আমার, আমার সরকার, দল, পরিবার ও রাজনৈতিক কার্যালয় সম্পর্কে অনেক কুত্সা রটিয়েছেন। আমি এর পাল্টা বক্তব্য দিতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী, তার পরিবারের সদস্যবর্গ ও আত্মীয়-স্বজন সম্পর্কে বিস্তার অভিযোগ ও তথ্য থাকা সত্ত্বেও আমি এ নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না। আমি মনে করি, অনেক হয়েছে। বাংলাদেশের সুরুচিবান মানুষ আর এসব শুনতে চান না। আমাদেরকে এই অপ-সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে জাতির আশা-আকাঙ্খার আলোকে, সময়ের দাবি অনুযায়ী নতুন ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদল করার, উন্নত করার এখন সময় এসেছে। এর সূচনা কাউকে না কাউকে করতেই হবে। আজ আমি আপনাদের সামনে সেই পরিবর্তনের আহ্বান নিয়ে এসেছি। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই। বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমরা মতৈক্যে পৌঁছাবার চেষ্টা করবো। কিন্তু সেই বিতর্কে অনেক সময় শোভনীয়তার সীমা ছাড়িয়ে যায়। পারস্পরিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। এই ধারার পরিবর্তন করতে হবে। রাজনীতির পরিভাষা শোভন, মার্জিত ও যুক্তিনিষ্ঠ হতে হবে।

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক বিতর্কে অতীত চর্চা, ব্যক্তিগত ও অশালীন আক্রমণ বন্ধ করা দরকার। তার বদলে আমরা বিতর্ক করবো আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের উত্কর্ষতা নিয়ে। বাংলাদেশের বিরাজমান সমস্যা ও সংকট সমাধানের পন্থা নিয়ে আমরা বিতর্ক করবো। ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনো সুফল বয়ে আনে না। এতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের নাগরিকেরা। এতে হিংসা ও হানাহানি প্রশ্রয় পায়। রাজনীতি অস্থির ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন হয়।

আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে সত্ ও দক্ষদের নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে উল্লেখ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুচিন্তা ও ভালো পরিকল্পনা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একার এখতিয়ারে নেই। আমরা যদি জাতি হিসাবে আমাদের সকল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই, আমরা যদি নাগরিকদের উন্নত জীবনের সন্ধান দিতে চাই, তাহলে রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে পরিচিত সমাজের প্রতিটি অঙ্গনের নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সকলের ভাবনা থেকে উপকৃত হবার সদিচ্ছা আমাদের থাকতে হবে। আগামীতে আমাদের সরকার হবে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার। আমাদের সরকার হবে মেধা ও মননশীলতার সরকার। জাতীয় ঐক্যের সরকার। যারা সমাজের জন্য অবদান রাখতে পারেন, যারা দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনেন, যারা সত্-যোগ্য-দক্ষ, যারা সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারেন, যারা নেতৃত্ব দিতে পারেন, রাজনৈতিক মত-ধর্ম-নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নির্বিশেষে সেই সব মেধাবী ও যোগ্য নাগরিকদেরকে আমি আগামী দিনের জাতীয় ঐক্যের সরকারের সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখছি।

বর্তমান সরকারের বিভিন্ন ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, জাতীয় জীবনে এখন এক ক্রান্তিকাল চলছে। আজ এমন এক সময়, যখন আমাদেরকে ঠিক করতে হবে, আমরা গণতন্ত্র নাকি স্বৈরশাসনকে বেছে নেবো। গত কয়েক বছরে একের পর এক ঘটে গেছে নানান মর্মান্তিক ঘটনা। রানা প্লাজা ধসে হাজারের বেশি শ্রমজীবী মানুষের করুণ মৃত্যুর ঘটনা বিশ্ববিবেককেও নাড়িয়ে দিয়েছে। শেয়ারবাজারের নিষ্ঠুর লুণ্ঠনে ৩৩ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পথে বসেছে। হলমার্ক, ডেসটিনি, ব্যাংকের তহবিল তসরূফ, পদ্মা সেতু কেলেংকারীর মতো ঘটনা কেবল কল্পনাতীত দুর্নীতিরই চিত্র নয়, বিশ্বে আমাদেরকে নানাভাবে কলংকিত করেছে। দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক দখলের চেষ্টা এবং নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা, সম্মানিত নাগরিকদের অসম্মান, মানবাধিকার কর্মী আদিলুর রহমান খান ও সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের ওপর নিবর্তনের ঘটনা সমাজের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের আতংকিত করেছে। এই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিহাসের পৃষ্ঠা নাগরিকদের রক্তে সিক্ত হয়েছে। ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে নিষ্ঠুর আক্রমণ, পিলখানা হত্যাযজ্ঞ, বিচার বহির্ভূত অবাধ হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, শ্রমিক নেতা আমিনুলসহ বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর গুম, খুন জনজীবনকে আতঙ্কিত করে রেখেছে। বিচারবিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ ও নগ্ন দলীয়করণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান বাবু হত্যাকারীরা বিচারের আওতায় আসেনি। ক্ষমতাসীনরা দ্রুত পেয়ে যান তাদের কাঙ্খিত রায়। খুনের মামলার আসামিরা মুক্তি পায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমায়। আইনের শাসন সুদূর—পরাহত। প্রশাসন, পুলিশকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং সরকারি দলের ছাত্র ও যুব শাখার সন্ত্রাসী কার্যক্রম শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সম্পদ দখল, তাদের উপসনালয়ে হামলার নৃশংস ঘটনা আমাদেরকে কলংকিত করেছে। জাতীয় ঐক্যকে করেছে বিপন্ন। এই অবস্থায় জাতীয় ঐক্যকে সংহত করা এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, পাহাড়ের মানুষ-সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে মিলে আমাদেরকে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় ঐক্য। গড়তে হবে অখণ্ড জাতীয় সত্তা। আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে গণতন্ত্রের জন্য। একত্র হতে হবে আজকের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির জন্য, পরিবর্তনের জন্য।

১৯৯৬ ও ২০০১ সালের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ
১৯৯৬ ও ২০০১ সালের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here