নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও দেশের বিদ্যমান সংকট নিয়ে বিরোধী-দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফোনে অথবা অন্য যেকোনো প্রক্রিয়ায় তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন। সংলাপের বিষয়টি সেখানে আলোচনা হতে পারে।
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের কাছে এ কথা জানিয়েছেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে তিনি ‘সর্বোচ্চ’ ছাড় দিতেও প্রস্তুত আছেন।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বিরোধীদলীয় নেতাকে যেকোনো দিন নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে চান। ইতিমধ্যে গত রোববার জাতীয় পার্টির সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
একাধিক সূত্র জানায়, বৈঠকে সর্বদলীয় সরকার গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, সে বিষয়ে মন্ত্রীদের একই ধরনের কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের বিষয়ে যেন আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়, সে বিষয়েও মন্ত্রীদের সতর্ক করেন তিনি।
বৈঠকে সর্বদলীয় সরকার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা হয়। মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে সর্বদলীয় সরকারের আকৃতি ও ধরন কেমন হবে, তা জানতে চাওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয়, এটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধী দলকে নিয়েই নির্বাচন করার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করা হবে। এ জন্য খালেদা জিয়ার সঙ্গে তিনি নিজেই যোগাযোগ করবেন। এ বিষয়ে মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান। একই সঙ্গে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ‘সঠিক’ ভাষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান কয়েকজন মন্ত্রী।
বৈঠকে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্যের সমালোচনা করা হয়। মন্ত্রীদের তরফ থেকে বলা হয়, তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে এখন ‘হাত ভেঙে’ দেওয়ার কথা বলছেন। বৈঠকে গ্রামীণফোনের শেয়ার ও গ্রামীণ ব্যাংক নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে একটি নোট তৈরি করে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার আরও বৈঠক হবে: বর্তমান সরকারের আমলে মন্ত্রিসভার আরও বৈঠক হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা। বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে। অনেকে ধারণা করেছিলেন, এই সরকারের আমলে হয়তো গতকালই ছিল শেষ বৈঠক। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এটি (গতকালের বৈঠক) বিদায়ী বৈঠক ছিল না। আরও বৈঠক হবে।’
আট সিদ্ধান্ত: বৈঠকে ‘জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি নীতিমালা, ২০১৩ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করাই এই নীতিমালার মূল বিষয়। নীতিমালা অনুযায়ী, পেশাগত স্বাস্থ্য সম্পর্কে ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
এই নীতিমালাসহ বৈঠকে মোট আটটি সিদ্ধান্ত হয়। ‘বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এই কর্তৃপক্ষের কিছু বিষয় আগে যেখানে বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ছিল, সেখানে এখন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় হবে।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় (সংশোধন) আইন, ২০১৩-এর খসড়া ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৩-এর খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিয়োটো প্রটোকলের দ্বিতীয় অঙ্গীকার পিরিয়ডের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধনী অনুসমর্থনের প্রস্তাব এবং বাংলাদেশ ও বেলারুশের মধ্যে দ্বৈত করারোপ পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি রোধসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন ও অনুসমর্থনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
দারিদ্র্য বিমোচন ও পল্লী উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের ‘সিরডাপ পদক’ প্রাপ্তির বিষয়টিও মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার প্রায় ৯৩ শতাংশ: মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, গতকাল পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ২২২টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকালের সভায় ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের বিষয়টি অবহিত করা হয়। এই সময় পর্যন্ত ২১৯টি বৈঠকে এক হাজার ৪৪২টি সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এক হাজার ৩৩৯টি। বাস্তবায়নের হার ৯২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই সময়ে আইন পাস হয়েছে ২৪০টি।
এর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের ৩ জুলাই পর্যন্ত ১৯৯টি বৈঠকে ৭০৭টি সিদ্ধান্ত হয়। যার মধ্যে বাস্তবায়িত হয় ৫৭০টি। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হার ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ। ওই সময়ে আইন পাস হয় ১৬০টি।log

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here