আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, লন্ডন, ১৯ মার্চ ২০১৩ –

abdul gaffডনকুইকজোট নিজেকে মধ্যযুগের একজন নোবল (সামন্ত) মনে করে একটি রুগ্ন ঘোড়ার উপর চেপে নোবুলদের পুরনো পোশাক অস্ত্রশস্ত্রে নিজেকে সজ্জিত করে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন পথে যা কিছু দেখতেন জান্তব অজান্তব সব কিছুকে তিনি শত্রু মনে করে হামলা চালাতে যেতেন এবং নিজেই ক্ষতবিক্ষত হতেন। দূর থেকে একটি উইল্ডমিল (বাতাসের কল) দেখে সেটিকে তার শত্রু ভেবে হামলা চালাতে গিয়ে গুরুতরভাবে আহত হন। ডনকুইকজোটের চরিত্রটি কাল্পনিক। লেখক বাস্তব চরিত্রটি আকায় বাধাবিপত্তি থাকায় এই স্যাটায়ারমূলক চরিত্রটি একেছিলেন। আজ এই লেখক বেঁচে থাকলে এই একুশ শতকের বাংলাদেশে একজন মহিলা ডনকুইকজোট খুঁজে পেতেন। তিনি বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার সাম্প্রতিক কার্যাকলাপ দেখলে তাকে বিনাদ্বিধায় সাদ্দাম ডনকুইকজোট আখ্যা দেয়া যায়।

গল্পের ডনকুইকজোটের মতো বেগম জিয়াও সিঙ্গাপুর ঘুরে এসেই যুদ্ধের শিঙ্গা ফুঁকিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেছেন। ডনকুইকজোট একটি রুগ্ন ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে পুরনো নোবলদের বর্ম, তলোয়ার ইত্যাদি পুরনো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন। বেগম জিয়াও জনধিকৃত এবং সন্ত্রাসী জামায়াতের পিঠে সওয়ার হয়ে ইসলাম বিপন্ন, শাহবাগ চত্বরের জনতার সকলে নাস্তিক মুরতাদ ইত্যাদি পুরনো সেøাগান (পুরনো অস্ত্র) নিয়ে যুদ্ধে নেমেছেন। এই যুদ্ধে আসল ডনকুইকজোটের মতো তিনি আহত ও পর্যুদস্ত হতে পারেন, এই হুঁশিয়ারি তাঁকে তাঁর কোন পারিষদ দিচ্ছে না। ডনকুইকজোট একটি উইন্ডমিলকে শত্রু কল্পনা করে আক্রমণ চালাতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। বেগম জিয়া শাহবাগ চত্বরের গণজমায়েতকে তাঁর শত্রু ভেবে যে হামলা শুরু করেছেন তাতে আখেরে তাঁর কপালে কী ঘটে তা দেখার রইল।

আমি বলছি, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের এ যুগের মাদাম ডনকুইকজোট। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি জনগণের একটা অংশের মধ্যে অন্যভাবেও পরিচিত হয়েছেন। এই পরিচয়টি হলো তিনি বাংলাদেশের জামায়াতের মহিলা আমির। জামায়াতের আসল আমির জেলে। ভারপ্রাপ্ত আমিরেরাও জেলে যাওয়ার ভয়ে প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে পারেন না। সুতরাং বেগমকেই শেষ পর্যন্ত নিজ দলের নেত্রীর দায়িত্ব বহন করার সঙ্গে জামায়াতের মহিলা আমিরের অঘোষিত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির ঘোষিত নেত্রী এবং জামায়াতের অঘোষিত আমির। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির বিরুদ্ধে জামায়াতী সন্ত্রাসের পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণের পর জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে এখন আর কোন পার্থক্য নেই। তাই অনেক মানুষের ধারণা, বেগম জিয়া এখন জামায়াতেরও আমির। এই ব্যাপারে একটি ঘোষণার শুধু বাকি।

ভাগ্যের পরিহাস এই যে, জামায়াতীরা বহুকাল প্রচার চালিয়ে এসেছে, নারী-নেতৃত্বে হারাম। কিন্তু বাস্তবে খালেদা জিয়ার নারী নেতৃত্ব মেনেই দীর্ঘদিন ধরে তাদের রাজনীতি করতে হচ্ছে, এমনকি তার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিত্বও করতে হয়েছে। তখন ইসলামের নির্দেশ অমান্য করা হয়নি। বিএনপি-জামায়াত প্রকাশ্য মৈত্রী শুরু হওয়ার দিনে যখন দেখা যেত জনসভার মঞ্চে সিংহাসনের মতো উঁচু এক চেয়ারে খালেদা জিয়া বসে আছেন, (বলা হতো হাঁটুর বাতের ব্যথার জন্য তাঁকে উঁচু চেয়ারে বসতে হয়) এবং তার চেয়ারের পায়ের কাছে জামায়াত নেতা গোলাম আযম বসে আছেন। তখন তো খবরের কাগজে ছাপা সেই ছবি দেখে আমার মারহাবা মারহাবা বলে চিৎকার করতে ইচ্ছে হতো।

বাংলাদেশের এবারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা সংঘাতময় বটে, কিন্তু এর একটা ভাল দিকও আছে। এই ভালদিকটা হলো, দেশের রাজনৈতিক পোলারাইজেশনটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। একদিকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শিবির এবং অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের অগণতান্ত্রিক, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শিবির। এতদিন তথাকথিত জাতীয়তাবাদী বিএনপি কখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল (যেহেতু দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানসহ তার অনেক সহকর্মী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) এবং কখনও অতীতের মুসলিম লীগের এবং বর্তমানের জামায়াতের সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী কর্মসূচী অনুসরণ করে দেশের রাজনীতিতে একটা বিভ্রান্তির কুয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছিল। তাছাড়া তাদের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিকতার একটা মুখোশও আঁটা ছিল।

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং তাদের চরম দ-ের দাবিতে শাহবাগ চত্বরের গণজাগরণের পর বিএনপির এই মুখোশটা একেবারে ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে আর কণ্ঠিবদলের প্রেম নয়, একেবারে ‘অঙ্গে আমার দেবে না অঙ্গীকারের’ প্রণয়। হরতালের নামে সাম্প্রতিক জামায়াতী সন্ত্রাসের পাশে বিএনপির প্রকাশ্য অবস্থান এবং জামায়াতের আমিরদের ভাষা অনুকরণ করে বেগম জিয়ার প্রকাশ্য হুমকি ধমকি এবং ভারত বয়কট নীতি দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের শক্তির বিভাজনটা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

দুঃখ হয়, বিএনপির এই অধঃপতন এবং আত্মহননের পথ অনুসরণ দেখে। এজন্য বিএনপির অধিকাংশ সাধারণ নেতাকর্মী দায়ী নন। দায়ী বেগম জিয়া এবং তার পারিবারিক স্বার্থ। প্রকৃত শিক্ষাদীক্ষাবিহীন তাঁর দুই পুত্র সর্বপ্রকার দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত জেনেও তাদের বিচার থেকে রক্ষা করা এবং দেশ ও দলের বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষা করে বড় ছেলে তারেক রহমানকে দলের নেতৃত্ব এবং দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের আসনে বসানোর ‘গ্রাম্য গোয়ার্তুমি’ তাঁকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে ফেলেছে এবং জামায়াতের শুধু একাত্তরের ঘাতকদের বিচার ঠেকানোর আন্দোলনে নয়, তাদের সর্বপ্রকার দেশদ্রোহিতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে বিএনপিকে অঙ্গাঙ্গি জড়িত করে ফেলেছে। এই পাকচক্র থেকে বিএনপির উদ্ধার লাভের আর কোন আশা আছে কি?

অথচ দেশে গণতন্ত্র স্থায়ী করার স্বার্থেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি দ্বিদলীয় ভিত্তি দরকার। প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শ ও কার্যক্রমের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু লক্ষ্য হবে অভিন্ন, দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখা। বাংলাদেশের দু’টি প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই লক্ষ্যেই অবিচল থাকবে আশা করা গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি আছে। কিন্তু সে মূল গণতান্ত্রিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি বলা চলে। বিএনপি সামরিক শাসকের দল হলেও এই দল জেনারেল জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বেগম খালেদার নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হতে যাচ্ছে, এই আশাই দেশবাসীর মনে এক সময় জেগে উঠেছিল।

এরশাদবিরোধী তথা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় বেগম খালেদা রাজপথে নেমে আসায়, সর্বপ্রকার দমন পীড়নের মোকাবেলা করায় সকল মহলেই আশা দেখা দিয়েছিল, আওয়ামী লীগের পাশাপাশি আরেকটি বড় গণতান্ত্রিক দলের আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগসহ সকল গণতান্ত্রিক দলের দাবি মেনে নিয়ে দেশ শাসনে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ায় এই আশা অনেকের মনেই আরও জোরদার হয়েছিল।

বেগম জিয়া শেষে এই আশা পূর্ণ করতে পারেননি। তিনি ধীরে ধীরে দলের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী অংশ এবং পাকিস্তানের আইএসআইয়ের দ্বারা পরিবৃত ও প্রভাবিত থাকেন। এই প্রক্রিয়া পূর্ণতা পায় তাঁর ছেলে তারেক রহমান বয়োপ্রাপ্ত হয়ে রাজনীতিতে অংশ নেয়ার পর। তারেক তার অশিক্ষা অমার্জিত স্বভাব এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের প্রতি আসক্তির দরুন জামায়াতকেই তার উপযুক্ত রাজনৈতিক সহচর বলে বেছে নেয় এবং ঘোষণা করে। ‘বিএনপি ও জামায়াত একই পরিবারভুক্ত লোক।’ জামায়াতের সন্ত্রাস এবং তারেক রহমানের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের আড্ডা হাওয়া ভবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভিশপ্ত ধারার সূচনা করে। তারেক দল থেকে পিতৃবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক অধিকাংশ প্রবীণ নেতাদের বিতারণ করে এবং মাকে শিখ-ির মতো সামনে খাড়া রেখে দেশের রাজনীতিতে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। কেবল বাকি ছিল যুবরাজ থেকে রাজা বলে ঘোষিত হওয়া।

বিএনপি’র গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এখানেই ব্যাহত হয়, শুরু হয় পাশ্চাৎগতি। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এক ‘আনহোলি এ্যালায়েন্স’ গড়ে ওঠে, যে এলায়েন্সের অভিশাপে আজ সারা দেশকে ভুগতে হচ্ছে। বিএনপি যদি জামায়াতের সঙ্গে এলায়েন্স না করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় অবিচল থাকত তাহলেই আওয়ামী লীগের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারত বলে অনেকেরই ধারণা। বর্তমানেও শেখ হাসিনার দ্বিতীয় দফার সরকারের আমলে ২০০৮ সালের নির্বাচন বিপর্যয়ের ধাক্কা সামাল দিয়ে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর বহু সহায়ক ইস্যু দেশে তৈরি হয়েছিল। নানা সমস্যা সমাধানে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘসূত্রতার ফলে তাদের জনপ্রিয়তা যেমন কম ছিল, তেমনি বিএনপি’র নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছিল।

সরকারবিরোধী আন্দোলন করার জন্য বিএনপির সামনে অনেক ইস্যু ছিল এবং এখনও আছে। যেমন, (ক) তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন দ্বারা আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা। (খ) দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি সাধন। (গ) তিস্তার পানি ও সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা সম্পর্কে ভারতকে প্রতিশ্রুতি পালনে এখনও রাজি করতে না পারা। (ঘ) পদ্মা সেতু সম্পর্কিত এবং সাম্প্রতিক বড় বড় দুর্নীতি সম্পর্কে কোন সন্তোষজনক পদক্ষেপ এখনও গ্রহণ করতে না পারা। (ঙ) শিক্ষাঙ্গনে ভয়াবহ ছাত্র-সন্ত্রাস এবং ছাত্রনেতাদের লাইসেন্স ও টেন্ডারবাজি বন্ধ করা। (চ) সাগর-রুনী, বিশ্বজিৎসহ বিভিন্ন হত্যার তদন্তের অগ্রগতি না হওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। বিদ্যুত ও পানি সঙ্কট এবং দ্রব্যমূল্যের ঘোড়দৌড় এখন অনেকটা হ্রাস পেলেও এগুলোর স্থায়ী সমাধানের দাবিও বিএনপির আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারত।

এসব দাবির ভিত্তিতে বিএনপি সংসদের ভেতরে দাবি তুলতে পারত এবং সংসদের বাইরে জনসমর্থিত আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হতো। কিন্তু খালেদা জিয়া সে পথে এগোননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জনসমর্থন লাভের আগেই তিনি তাকে শিকেয় তুলে রেখে জামায়াতের সঙ্গে কোমরবেঁধে ’৭১-এর ঘূণ্য দেশদ্রোহী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ- থেকে রক্ষার জন্য নির্লজ্জভাবে মাঠে নেমেছেন এবং জনধিক্কার লাভ করছেন। একেবারে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য না হলে তিনি শাহবাগ চত্বরের গণজমায়েতকে নাস্তিক, কাফির ইত্যাদি বলে জামায়াতীদের সঙ্গে একই ফতোয়া দিতেন না এবং গোটা জনসমাজকে তার শত্রুপক্ষ করে তুলতেন না।

এটা তো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অথবা হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি’র কোন আন্দোলন করা নয়, বিএনপি’র এই আন্দোলন ও অবস্থান তো দেশের গণসমাজের-বিশেষ করে যুব সমাজের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের এক শিবিরে বিএনপি ও জামায়াত এবং অন্য শিবিরে দেশের জনতা। আওয়ামী লীগ তো এখন জনতার কাতারে মিশে গেছে। তাকে বিএনপি আঘাত হানবে কোথায়? আঘাত হানতে হলে তাঁকে জনতার বিরুদ্ধে আঘাত হানতে হবে, জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। বিএনপি নেত্রীর হালের বোলচাল দেখে মনে হয়, তিনি এখন জনতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নেমেছেন। যে যুদ্ধে জনতার পরাজয় অসম্ভব।

যদি ধরে নেয়া যায়, বিএনপি ও জামায়াতের বর্তমান সন্ত্রাস হচ্ছে একটি আন্দোলন বা যুদ্ধ; তাহলে প্রশ্ন, এই আন্দোলনের চরিত্র ও লক্ষ্যটা কি? চরিত্র মোটেই আন্দোলনের নয়, বরং সন্ত্রাসের। লক্ষ্য জনগণের কোন দাবি দাওয়া আদায় করা নয়; বরং জনগণের শত্রুদের বিচার ও দ- থেকে রক্ষা করা এবং দেশের গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার কাঠামোকে ধ্বংস করা। ‘৭১ সালের পাকিস্তানী হানাদারদের কার্যক্রমের সঙ্গে বর্তমান বিএনপি ও জামায়াতের সন্ত্রাসের সামঞ্জস্য লক্ষণীয়।

‘৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদাররা প্রথমেই ঢাকায় ভাষা শহীদ মিনার কামান দেগে ধ্বংস করেছিল; বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের সন্ত্রাসের টার্গেট হচ্ছে বিভিন্ন স্থানের শহীদ মিনার। সিলেটে শহীদ মিনারে হামলা চালানোর পর বিএনপি’র বর্তমান হরতালের সময় সুনামগঞ্জের শহীদ মিনারটিতে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। বর্তমান সন্ত্রাসের লক্ষ্য যদি হয় আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটান, তাহলে শহীদ মিনারের মতো জাতীয় স্মৃতি সৌধগুলোর ওপর হামলা কেন?

কোন গণআন্দোলনে কি বারবার নিরীহ বাসযাত্রী বা ড্রাইভার পুড়িয়ে মারা হয়? বিএনপি’র এবারের হরতালে আবার ফেনীতে এক তরুণ বাস ড্রাইভারকে হত্যা করা হয়েছে। ঢাকায় তিনজন ডাক্তারের ওপর বোমা হামলা করা হয়েছে। তাঁদের একজনের অবস্থা সঙ্কটজনক (হালনাগাদ খবর জানি না)। কোন গণআন্দোলনে পুলিশ হামলা না চালালে এভাবে নিরীহ মানুষ নিহত হয় তার নজির বিরল। এটা এখন স্পষ্ট বিএনপি ও জামায়াত যুক্তভাবে আন্দোলন সৃষ্টিতে এবং জনসমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়ে এই সন্ত্রাসের পথ ধরেছে এবং প্রকারান্তরে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। বেগম জিয়া তাঁর এই যুদ্ধ আসলে কার বা কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তা বুঝতে পারছেন কিনা জানিনা। তিনি বলছেন বটে, ‘লাশ পড়েছে, আরও পড়বে, এই সরকারের পতন না ঘটিয়ে ছাড়ব না’, কিন্তু তাঁর বোঝা উচিত এই যুদ্ধটা পুরোপুরি সরকারের বিরুদ্ধে না হয়ে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে এবং লাশ পড়ছে নিরীহ জনগণের।

বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান কার্যকলাপকে আমি যুদ্ধ বলছি বটে, আদতে চরিত্রে ও লক্ষ্যে এটা সন্ত্রাস। সন্ত্রাস দ্বারা কোন লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। অর্জন করা গেলে ব্রিটেনে আইআরএ সন্ত্রাস এবং ভারতে নকশাল সন্ত্রাস জয়ী হতো। বছরের পর বছর এই সন্ত্রাস চলেছে। কিন্তু জয়ী হয়নি। আইআরএ সন্ত্রাসীরা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের মতো রাজ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যকেও (ভারতের শেষ ব্রিটিশ বড়লাট) হত্যা করে লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়নি। লন্ডনে ব্যাপক বোমা হামলা চালানও ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ ভুগেছে। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কখনও ব্যাহত হয়নি।

বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত কতদিন সন্ত্রাস চালাবে? আরও ছ’মাস, এক বছর? তাদের এই শক্তি ও সক্ষমতা সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে তারা কোন অশুভ শক্তিকে ক্ষমতা দখলে প্ররোচিত করতে চান? বিশ্ব পরিস্থিতি তার অনুকূল নয়। অনুকূল হলে আমাদের কারজাই ও জারদারিরা তো প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। তারা কল্কে পাচ্ছেন না কেন? তারা কল্কে পেলেও বিএনপি-জামায়াতের কপালে শিকে ছিঁড়বেনা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করা যাবে না। তারেক রহমানকেও বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে না। জনগণের সঙ্গে যুদ্ধে সন্ত্রাস আপাত: সাফল্য দেখাতে পারে, কখনও জয়ী হয় না।

লন্ডন ১৯ মার্চ, মঙ্গলবার, ২০১৩

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here