আমাদের দেশে ফসল উৎপাদনে এ রয়েছে কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব ও যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত হাজার হাজার ব্র্যান্ডের কীটনাশক বাজারজাত করা হচ্ছে। অন্যদিকে কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর যে উদ্যোগ তা সীমিত। ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশকের প্রভাবে ক্যান্সার সহ যকৃৎ ও কিডনি নষ্ট হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে আরও নানান রোগব্যাধি। মানবদেহে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বিরূপ প্রভাব কমিয়ে আনার জন্য বেশ কিছু কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন অতি জরুরী হয়ে পড়েছে। কীটনাশকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা বা ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে যা সংশোধন করে নিন্মলিখিতি ব্যবস্থাগুলি গ্রহন অতীব জরুরী। এই ব্যবস্থাগুলো না থাকার ফলে মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনছে যা অপূরণীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

১। কীটনাশকের এমআরএল (Maximum Residue Limit, MRL) টেস্ট না করেই লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে। অর্থাৎ লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে এমআরএল টেস্ট করার কোন বিধান লাইসেন্সের শর্তে রাখা হয়নি। লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারী তার কাগজপত্রে যে এমআরএল মাত্রা উল্লেখ করে দিচ্ছে তা শর্তহীন ভাবে মেনে নেয়া হচ্ছে। একটি কীটনাশকের এমআরএল যদি ৭ দিন হয় তাহলে কোন অবস্থাতেই এই ৭ দিনের মধ্যে ফসল বাজারজাত বা খাওয়া যাবে না। কারণ এই সময় পর্যন্ত বিষের মাত্রা সর্বাধিক থাকবে। এখন কীটনাশক আমদানিকারক বা ব্যবসায়ী যদি তথ্য গোপন করে অধিক লাভবান হবার জন্য মিথ্যা এমআরএল উল্লেখ করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে বিনা পরীক্ষায় লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়, তবে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিশ্বে কোন দেশে এমআরএল পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেয়া হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে তা হচ্ছে। কাজেই মানবকল্যাণে লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে অবশ্যই প্রতিটি কীটনাশকের এমআরএল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।

২। একটি কীটনাশকের মূল উপাদান বা কার্যকর ইনগ্রিডিয়েণ্ট যে তরল বা পদার্থের সাথে মিশানো থাকে তাকে বলা হয় ক্যারিয়ার এজেন্ট। এই ক্যারিয়ার এজেন্ট কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা তৈরি হয় না। কিন্তু কোন কীটনাশকের আবেদনকারী যদি অতি লাভের আশায় সেই ক্যারিয়ার এজেন্টে কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ভারী ধাতু মিশিয়ে নিয়ে আসে তাহলে লাইসেন্স প্রদানের সময় তা ধরার কোন উপায় নেই। কারণ একটি কীটনাশকের ক্যারিয়ার এজেন্টে কি কি উপাদান আছে লাইসেন্সের আবেদনে তা উল্লেখ করার বিধান রাখা হয়নি এবং ক্যারিয়ার এজেন্ট পরীক্ষা করারও কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। কাজেই লাইসেন্সের আবেদনে ক্যারিয়ার এজেন্টের নাম উল্লেখসহ লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে অবশ্যই ক্যারিয়ার এজেন্টের রাসায়নিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।

৩। সেকেন্ডারি মেটাবলিজম (Secondary Metabolism) হচ্ছে কোন গাছে কীটনাশক স্প্রে করা হলে ঐ কীটনাশক গাছের বিভিন্ন ছত্রাক ও জীবাণুর সাথে বিক্রিয়া করে অনেক সময় মারাত্মক বিষের সৃষ্টি করে যা মানবদেহের ভয়ানক ক্ষতি সাধন করে থাকে। উন্নত বিশ্বে সেকেন্ডারি মেটাবলিজম পরীক্ষা করে তবেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেকেন্ডারি মেটাবলিজম পরীক্ষা করার মত কোন পরীক্ষাগার নেই। জনকল্যাণে সেকেন্ডারি মেটাবলিজম পরীক্ষার সক্ষমতা অর্জন করে তা লাইসেন্স প্রদানের শর্তে অন্তর্ভুক্ত করা বিশেষ প্রয়োজন।

৪। ফসলে কোন কীটনাশক স্প্রে/ব্যবহার করার পর সেই ফসল কতদিনের মধ্যে বাজারজাত করা যাবে না (এমআরএল) তা সেই কীটনাশকের বোতল বা প্যাকেটে স্পষ্ট করে লিখা বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।

৫। লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে মানদেহে এর বিষক্রিয়া বা টক্সিসিটি পরীক্ষা করা হয় না। যা অন্যকোন দেশে অকল্পনীয়। আশ্চয্যজনক হলেও সত্য যে মাছের উপর বিষক্রিয়া টেস্ট করার নিয়ম রাখা হয়েছে কিন্তু মানুষ বাদ গিয়েছে। মানবকল্যাণে অবশ্যই লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে প্রত্যেক কীটনাশকের মানবদেহে এর টক্সিসিটি পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

৬। অনেক কীটনাশকের লাইসেন্স গ্রহণের সময় আবেদনকারী একটি ক্যামিকেলের (মূল উপাদান) ঘোষণা দিয়ে লাইসেন্স গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু আসলে ঐ কীটনাশকে প্রকৃতপক্ষে আরও দুই তিনটা ভয়ানক বিষ মেশানো থাকে যা তারা ঘোষণা দেয় না। লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে মূল উপাদানের সাথে আর কোন উপাদান বা বিষ আছে কি নেই, তা পরীক্ষা না করেই লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে। লাইসেন্স প্রদানের পূর্বে আবেদিত কীটনাশকের সকল উপাদান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।  

৭। আমাদের দেশের কৃষক নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে যথেচ্ছ মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার করে চলেছে। যেখানে এক বোতল হলেই চলে সেখানে তারা কীটনাশকের দোকান হতে চার বোতল কীটনাশক এনে ঢালছে। এতে একদিকে যেমন মানবদেহের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে অধিক কীটনাশক ব্যবহারে জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। উপকারী পোকামাকড়, মাছ ও পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে। আমরা যেমন ফার্মেসী থেকে ইচ্ছেমত ঔষধ কিনে থাকি কোন প্রেসক্রিপশন লাগে না। কৃষকরাও তেমনি প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ইচ্ছেমত কীটনাশক বালাইনাশক কিনে থাকে। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি দেশে একজন কৃষক সে দেশের কৃষি বা হেলথ ডিপার্টমেন্টের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এক বোতল কীটনাশক কিনতে পারে না। আমাদের দেশেও এমন আইন চালু করা উচিৎ যে মাঠ পর্যায়ের কৃষি বিভাগের কর্মীর প্রেসক্রিপশন ছাড়া কীটনাশক বিক্রেতারা কারো কাছে সামান্য পরিমাণ কীটনাশক বিক্রি বা কেউ কিনতে পারবে না।.

৮। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তার ছাড়পত্র নিয়ে ফসলে কীটনাশক দেয়ার পর যতদিন ফসলে কীটনাশকের ক্ষতিকর তলানি থাকবে (এমআরএল), ততদিন পর্যন্ত কৃষক তার ফসল বাজারে তুলতে পারবে না। অর্থাৎ বাজারে বিক্রির জন্য ফসল তুলতে হলে অবশ্যই কৃষি বিভাগের ছাড়পত্র নিতে হবে। একটি কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব যদি পনের দিন থাকে (এর পর খেলে কোন সমস্যা হবে না), কিন্তু দেখা যাচ্ছে কৃষক সেই কীটনাশক সকালে স্প্রে করে বিকালেই বাজারে তুলছে এবং সন্ধ্যায় তা আমাদের পেটে যাচ্ছে। প্রতি ইউনিয়নে ৩ জন করে কৃষি বিভাগের কর্মী নিয়োগ দেয়া আছে। তারা এই সমস্ত কাজ করতে অবশ্যই সক্ষম। এমআরএল নির্ধারিত সময়ের পূর্বে এবং অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনছে। এবতাবস্থায় উপর্যুক্ত বর্ণনার আলোকে কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ অর্ডিন্যান্স, ২০১০ এর প্রয়োজনীয় সংশোধন পূর্বক এর অপব্যবহারের জন্য কঠিন শাস্তির বিধান রাখা সহ কৃষিবিভাগীয় কর্মকর্তাদের আরও অধিক প্রায়োগিক ক্ষমতা দিয়ে আইনটির কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ জানানো হল।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here