pic-21_35800সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, মানুষ কথা বলছে সমঝোতার বিষয়ে, কিভাবে দুই দল এবং দুই নেত্রী অনমনীয় হয়ে উঠছেন- সে বিষয়ে। প্রকৃত কথা হলো, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপিকে বারবার সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও তা উপেক্ষিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিজে বিরোধীদলীয় নেতাকে শর্তহীন সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং সমস্যা সমাধানের বেশ কিছু উপায় বাতলেছেন, যেমন- সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ সরকারের যেকোনো মন্ত্রণালয় গ্রহণের প্রস্তাব তাদের আমরা দিয়েছি, এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও। এমনকি দ্রুত ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথাও বলেছি, এটাও সমঝোতারই প্রস্তাব, যাতে ২৫ জানুয়ারি কোনো অসাংবিধানিক সরকারের হাতে ক্ষমতা না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ গঠনমূলকভাবেই প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছে; অন্যদিকে বিএনপি সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ক্রমবর্ধমান সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
সমঝোতা হলে কী সুফল পাওয়া যেতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর গোঁয়ার্তুমি ও গোঁয়ার নেতাদের কারণে কী করে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো, সে বিষয়ে অনুমান-অভিমত দাঁড় করানো সহজ। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা এ অবস্থায় উপনীত হয়েছি জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই। যাঁরা পাঁচ বছর ধরে দাবি জানাচ্ছেন, আমরা যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামায়াত নিষিদ্ধ করি- তাঁদের অনেকেই এখন বলছেন, আমরা যেন সব কিছুর বিনিময়ে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করি। কেউ কি ওই সব ব্যবস্থার পরিণতির কথা ভেবেছেন? জামায়াত বসে থেকে বিলয়ের পথ ধরেনি। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরের সময় বিএনপি-জামায়াত জোট নিশ্চুপ বসে থাকেনি।
আমাদের দেখা দরকার, ঝুঁকিটা আসলে কী। কারণ সমঝোতার খাতিরে সমঝোতার ভাবনা যেমন দুরভিসন্ধিমূলক তেমনই ক্ষতিকর। এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা নিয়ে আমরা আপস করব না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার বিষয়ে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমরা আপস করব না। ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যেতে আমরা কুণ্ঠাবোধ করব না। যদি বিএনপির দাবি মেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দিতেন, তাহলে কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর কাজটি হতো না। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই- সাহস ও সামর্থ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের বিপরীতে দাঁড়ানো অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হবে না।
অবশ্যই আমরা সহিংসতা চাই না, তবে আসুন ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে তাকাই। আমাদের মুক্তির আন্দোলনের সময় আমরা স্বাধীনতার দাবি তুলিনি এবং আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করিনি। আমরা যা চেয়েছিলাম, তাহলো জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের পর একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার অধিকার। সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো আপস-রফার বিষয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খানের অনিচ্ছুক মনোভাবের কারণে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি; বরং তিনি বল প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমাদের ওপর হামলা প্রথমে পাকিস্তানি সেনারাই চালায়, ২৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আগেই। যুদ্ধ এড়ানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর কি সমঝোতা করা উচিত ছিল, আমাদের অধিকার ত্যাগ করা উচিত ছিল?
বিএনপি কিন্তু তার কর্মকাণ্ডে এবং দাবিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। তারা গণতন্ত্রের বিষয়ে তাদের দরদের ঘাটতি এবং জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি অবজ্ঞার বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে ব্যক্ত করেছে। যতবার বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, ততবারই নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা চালিয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাগুরা ও ঢাকা-১০ আসনের নির্বাচনের কথা মনে আসে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও (১৫ ফেব্রুয়ারি) তারা কারচুপি করেছে, যদিও ওই নির্বাচনে তাদের কোনো প্রতিপক্ষ ছিল না। ২০০৬ সালে তারা এক কোটি ৪০ লাখেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকাভুক্ত করে। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ভরসার বিষয় হয়ে থাকতে পারেনি, কারণ তারা নির্বাচনে কারচুপির উদ্দেশ্যে খোদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাতেই বিকৃতি ঘটিয়েছে, যার ফলে সেনা হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
বুঝতে ভুল না হয় যেন- ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে শুধু একটি দলের জন্য, সেই দলটি হলো বিএনপি। তারা জামায়াতের সঙ্গে দেশবিদ্বেষী জোট গঠন করে, নিরীহ মানুষের ওপর বোমা হামলা চালিয়ে, অগ্নিসংযোগ করে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের অধিকারকে অস্বীকার করেছে। হ্যাঁ, এটি আদর্শ নির্বাচন হবে না, তবে সেটি নিজ গুণেই আলোচনার দাবি রাখে। এর পরও জনগণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পাবে। এটা ভেবে বোকা বনার কোনো মানে নেই যে বিএনপি-জামায়াতের লাগামহীন অযৌক্তিক সহিংসতা কেবলই নির্বাচন ঘিরে। এসব করা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য।
এমনকি কোনোভাবে যদি বিএনপিকে আমরা নির্বাচনে আনতে পারতাম, এর পরও যত দিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলবে, তত দিন বিএনপি-জামায়াত সহিংসতা চালিয়ে যাবে। যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির বিষয়ে আপস করলেই কেবল তারা সহিংসতা বন্ধ করবে। বিএনপি ও জামায়াত বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। নির্বাচনের জন্য আন্দোলনের নামে তারা জনগণকে সন্ত্রস্ত করছে, আতঙ্কিত করছে; উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা। যদি দাবিটা এমন হয়, সব কিছুর বিনিময়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে হবে, সহিংসতা থামাতে হবে তাহলে আমার জিজ্ঞাস্য- আপনি কি এ মূল্য দিতে রাজি?
আমরা সেই মূল্য দিতে রাজি নই; কারণ সেটা হবে আমাদের স্বাধীনতার বিষয়ে আপস, যে চেতনা আমাদের একটি জাতিতে পরিণত করেছে তার সঙ্গে আপস। এ ধরনের আপস বা সমঝোতা হবে যাঁরা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন, সেই ৩০ লাখ শহীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। যতটা সম্ভব আমরা সমঝোতা করার চেষ্টা করেছি, যেমনটা করেছি ১৯৭১ সালে। কিন্তু আমাদের সমঝোতার উদ্যোগের জবাব দেওয়া হয়েছে সহিংসতার মাধ্যমে। আমরা এ সংঘাত ডেকে আনিনি, বরং এই সংঘাত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন সময় ঋজু হয়ে দাঁড়ানোর, জবাব দেওয়ার। এখন সময় একাত্তরের চেতনার পুনঃ প্রতিষ্ঠার, এসব স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here