জনতার নিউজ

বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল অনেকেই

আমরা আজকে এখানে সমবেত হয়েছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লিখিত কারাগারের যে তাঁর স্মৃতির কথাগুলি, তার প্রকাশনা উপলক্ষে। ‘কারাগারের রোজনামচা’ যে বইটি আমরা বের করলাম এটা দ্বিতীয়খণ্ড, দ্বিতীয় বই। এর পূর্বে আমরা বের করেছি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’।

কারাগারের এই বইটি আপনারা যদি নিজেরা দেখেন এখানে উনার লেখা অনেকগুলি খাতা। তার মধ্যে একটি খাতা যেটা বহু বছর পরে এটা খুঁজে পাওয়া, আমার লেখায় এগুলি তুলে ধরেছি। জেলখানায় এই খাতাটা বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং সেই তথ্যটা পেয়েছিলাম এসবি’র রিপোর্ট থেকে। ’৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি তখন এসবি’র রিপোর্টগুলি নিয়ে এসে সেগুলি ফটোকপি করে রেখে দেই এবং সেখান থেকে জাতির পিতার জীবনের অনেক তথ্য জানতে পারি। সেখানেই জানতে পারলাম যে, দু’খানা খাতা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

তো দ্বিতীয়বার যখন সরকারে আসলাম তখন আমি এসবিকে বললাম, এখানে এসবি’র যে বসে আছেন, তাকে দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলাম যে, এই খাতাটা আমাকে খুঁজে বের করে দিতে হবে এবং ওখানকার কর্মকর্তারা সবাই কষ্ট করেছে এবং ২০১৪ সালে এসে সেই খাতাটা আমি পেলাম যে খাতাটায় বঙ্গবন্ধু নিজেই কিন্তু নাম দিয়ে গেছেন। এই খাতায় লিখেছিলেন, ‘থালাবাটি কম্বল জেলখানার সম্বল’।

আমার মায়ের কথা বারবার মনে পড়ে। কারণ আমার মা সবসময় যখনই বাবা গ্রেফতার হতেন তিনি লেখার জন্য খাতা দিতেন এবং বারবার উত্সাহ দিতেন লিখার জন্য। আর এই খাতাগুলো অত্যন্ত সযতনে রেখে দিতেন।

১৯৭৫ সালে বাবা, মা, ভাই, বোন সবই হারিয়েছি। ঐ বাড়িতে এমন একজন কেউ ছিল না যে, কেউ কিছু বলতে পারে। আর আমরা দুই বোন ছিলাম বিদেশে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ফিরে আসি। প্রথমে তো আমাকে ঐ বাড়িতে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। তারপরে যখন আমি যেতে পারি তখন অন্য কোনোকিছুই না, প্রথমে আসলে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। এরপরে যখন আমার একটু  হুঁশ হলো, আমার শুধু মনে হচ্ছিল মায়ের হাতে রাখা ঐ খাতাগুলি কীভাবে উদ্ধার করা যায় এবং আমি কিন্তু ঐ বাড়ি থেকে ঐ সময় শুধু ঐ খাতা কয়টাই নিয়ে এসেছিলাম, আর কিছুই  নেওয়ার মতো ছিলও না, মনও ছিল না। কারণ চারদিকে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ, সেই অবস্থার মধ্যে আমাকে দেখতে হয়েছে ধূলাবালি মাখা সব জালের মধ্য দিয়ে, তখন এই খাতাগুলি নিয়ে আসি।

এখানে আর একটি খাতা আপনারা দেখবেন ১৯৬৮ সালের, ওটা হচ্ছে উনার শেষ লেখা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এবং এরপরেই আগরতলা মামলা হয়। ৫ মাস পরে তিনি এই খাতাটা পান। কারণ মামলা শুরু হওয়ার পরে খাতাটা তার হাতে দেওয়া হয়েছিল। তো সেখানে খুব অল্পই লেখা আছে। কিন্তু ঐ খাতাটা নিয়েই আমার একটা স্মৃতি রয়ে গেছে। সেটুকুই শুধু আপনাদের কাছে আমি আজকে বলতে চাই।

জানুয়ারি মাসের পর থেকে আমরা জানতাম না উনি কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন, বেঁচে আছেন কি না- কিছুই জানতে পারিনি। কোনো খবর আমরা জানতাম না। কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাঁকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

যখন মামলা শুরু হলো সেই কোর্ট সেটাও ছিল ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে। তখনই প্রথম তাঁর সঙ্গে দেখা হলো। এরপরে আমরা মাঝে মাঝে সাক্ষাত্কারের অনুমতি পেতাম। উনাকে অফিসার্স মেসে রাখা হতো। আমি যখন যেতাম তো আমি খাটে বসে হঠাত্ দেখি বালিশের নীচে একটা খাতা। তো আমার কী মনে হলো, আমি আস্তে খাতাটা বের করে পড়তে শুরু করলাম।

আমি যখন পড়তে শুরু করলাম তখন আব্বা আর মা পাশাপাশি চেয়ারে বসে, আব্বা এই জিনিসটা লক্ষ্য করলেন। উনি উঠে এলেন। আস্তে আমাকে জড়িয়ে ধরে কোনো বকাও দিলেন না, কিচ্ছু বললেন না, শুধু হাত থেকে খাতাটা নিয়ে নিলেন। নিয়ে শুধু এটুকুই বললেন, এখন পড়বি না, আমার মৃত্যুর পরে পড়বি। আমার হাত থেকে তিনি খাতাটা নিয়ে রেখে দিলেন।

’৭৫-এর ১৫ই আগস্টের পরে যখন এ খাতাগুলি হাতে পেলাম, সত্যি কথা বলতে কি এগুলি পড়া আমার জন্য খুব কষ্টের ছিল। আমার বান্ধবী ছিল বেবী, ও সবসময় আমার পাশে থাকত, সাহায্য করত। কিন্তু খাতাগুলি যখন পড়ব, কেন যেন কিছুতেই সেই সাহসই পেতাম না। আর বারবার বাবার সেই কথাটা মনে পড়ত।

যাই হোক আমরা এগুলি বই আকারে বের করতে পেরেছি এবং আজকে সকলের হাতে তুলে দিতে পেরেছি। হয়ত ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে যদি থাকতাম আমরা দুই বোনও বেঁচে থাকতাম না।

বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। একজন মানুষ তাঁর জীবনে সংগ্রাম করে দু’টি দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। একটা হলো পাকিস্তান, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লে আপনারা দেখবেন যে, সেই পাকিস্তান অর্জনের পিছনে তাঁর কী অবদান রয়েছে। আর যখন তিনি উপলব্ধি করলেন যে, এই পাকিস্তানের অধীনে বাংলাদেশের মানুষ শোষিত, বঞ্চিত, বাংলাদেশের মানুষের কোনো অধিকার নেই; বাংলাদেশের মানুষের টিকে থাকা সম্ভব না; তখন তিনি বাঙালির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করলেন।

আমরা আমাদের জীবনে একটানা দুই বছরও বাবাকে কাছে পাইনি। তবে, আমার মা অত্যন্ত সাহসী ছিলেন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর ছিল বিরাট অবদান। তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে কিছুই চাননি। কিন্তু সবসময় বাবার কাজে সহযোগিতা করেছেন এবং আমাদেরও সেভাবে গড়ে তুলেছেন।

আপনারা এই বইয়ের একটি জায়গায় দেখবেন তিনি লিখেছেন (এইটি আলাদা একটা খাতায় আমরা পেয়েছিলাম।) আমি একটু পড়ছি: ‘‘৮ই ফেব্রুয়ারি দু’বছরের ছেলেটা এসে বলল, আব্বা বালি চল। কী উত্তর ওকে আমি দেব। ওকে ভুলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি  তুমি যাও, আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়? কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ, আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলে-মেয়েরা বুঝতে শিখেছে, কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শেখে নাই। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’’

ছোটবেলায় আব্বার সাথে দেখা তো জেলখানায়ই হতো। যখন জামাল ছোট, এরপরে রেহানা, তারপরে রাসেল, আমি আর কামাল একটু বড় ছিলাম। আমরা জানতাম যে, আমার বাবা দেশের মানুষের জন্য কাজ করে। তাই, আমাদের কোনো আবদার কোনোকিছু বাবার কাছে ছিল না বরং যতটুকু সময় উনি বাইরে থাকতেন স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে এমনভাবে আমাদের ভরিয়ে দিতেন যে, আমরা না পাওয়ার বেদনাটা ভুলে যেতাম। এত আদর, এত ভালোবাসা কোনো সন্তান পায় কি না তা আমরা জানি না।

যা হোক আমার জীবনের এইটুকুই সার্থকতা যে, এত ঝড়-ঝঞ্ঝা, এত কিছুর পরেও উনার লেখাগুলিকে আমরা খুঁজে পেয়েছি এবং বাংলাদেশের মানুষকে তিনি ভালবেসেছেন। তাঁর জীবনের সবকিছু বাংলাদেশের মানুষকে ঘিরে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এদেশের মানুষকে তিনি সব থেকে বেশি ভালোবাসেন।

ডেভিড ফ্রস্ট যখন জিজ্ঞেস করেছেন যে, আপনার কোয়ালিফিকেশন কী? উনি বলছেন, আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসা। যখন জিজ্ঞেস করেছেন, ডিসেকায়ালিফিকেশন কী? বললেন, দেশের মানুষকে আমি অতিরিক্ত বেশি ভালোবাসি। তাই ভালোবাসা মানুষের প্রতীক। কারণ বাংলার মানুষকে একটা সুন্দর জীবন তিনি দিতে চেয়েছিলেন। আর সেই বাংলার মানুষের যে স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, একটা রাষ্ট্র দিয়ে গেছেন, আত্মপরিচয়ের সুযোগ দিয়ে গেছেন কিন্তু মানুষকে মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ করে দেবার জন্য যখনই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তখনই তাঁকে আর সময় দেওয়া হয়নি।

স্বাধীনতার পর একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ- যে দেশটা ছিল একটা প্রদেশ। ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা যে দেশটি শাসিত। এরপর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা শাসিত সেই দেশের শাসনভার পেয়ে ’৭২ সালে অল্প সময়ের মধ্যে একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলা—এটা এতো সহজ কাজ ছিল না; কিন্তু এখন আমার মাঝে মাঝে এটাই দুঃখ হয় যে, তখনো তো কেউ সময় দেয়নি। অনেকেই তো কত সমালোচনা—এটা হলো না, ওটা হলো না। ধৈর্য নেই, নানা ধরনের কথা কতকিছু মনে হলো যেন সেই সময় মানে উনার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে করতে সেই স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি তাদের হাতকেই যেন শক্তিশালী করে দিল। আর এখনো আমার মাঝে মাঝে এটাই মনে হয় যে, এই যে তাঁর বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা, নানা কথা লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনটাকে কেড়ে নেওয়ার পথটা অর্থাত্ ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটাবার একটা যেন পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল অনেকেই।

পরবর্তীকালে হয়ত তারা উপলব্ধি করতে পারছেন যে, কী তারা হারিয়েছিলেন। আর এই বই পড়ার মধ্য দিয়ে- ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’—এই দুইটি বই পড়ার মধ্য দিয়ে অন্তত বুঝতে পারবেন যে, একটি মানুষ একটি দেশকে ভালোবেসে দেশের মানুষের জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন। জীবনের কোনোকিছু কোনো চাওয়া-পাওয়া রাখেননি। শুধু এদেশের মানুষকে তিনি কিছু দিয়ে যেতে চেয়েছেন। রাষ্ট্র দিয়ে গেছেন, আত্মপরিচয়ের সুযোগ দিয়ে গেছেন, ঠিকানা দিয়ে গেছেন। সবসময় তিনি রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন,

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই।

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

উদাত্তকণ্ঠে এই কথা, উচ্চারণটা সবসময় করতেন। আজকে সেটাই তাঁর জীবনে বাস্তব হলো। নিঃশেষে প্রাণটা দিয়ে গেলেন কিন্তু তাঁকে যারা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল তারা তা পারলো না। তিনি সেই ইতিহাসে আবারও ফিরে এসেছেন এবং এই বাংলার মাটিতে আবার ফিরে এসেছেন।

আর আমাদের, আমার একটাই কাজ যে, বাংলাদেশকে তাঁর সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলা। সেটুকুই শুধু করে যেতে চাই যতটুকু পারি। তাঁর দুঃখী মানুষের মুখে যেন হাসি ফুটিয়ে যেতে পারি। যখনই একটু কাজ করি, যখন কোন ভালো কাজ হয় তখন কেবল এইটুকু মনে হয় যে, আমার আব্বা আজ বেঁচে নেই, উনি থাকলে বহু আগেই তো বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ সত্যি উন্নত জীবন পেত। কিন্তু আজকে তিনি বেঁচে নাই। যদি একটু ভালো কাজ করি নিশ্চয়ই তাঁর আত্মা তো শান্তি পাবে। তিনি নিশ্চয়ই দেখেন, নিশ্চয়ই জানেন, তিনি নিশ্চয়ই এটা উপলব্ধি করতে পারেন।

কাজেই আজকে আমি এইটুকুই বলব যে, এই লেখার মধ্য দিয়ে অনেককিছু জানতে পারবেন। তবে এখানেই শেষ না তাঁর লেখা আরও আছে। সেগুলিও আমরা ধীরে ধীরে প্রকাশ করব এবং সেগুলোও মোটামুটি প্রস্তুত এবং যেহেতু ২০২০ সালে জন্মশতবার্ষিকী, এই জন্মশতবার্ষিকীর মধ্যেই এ লেখাগুলো সব আমরা প্রকাশ করব।

সেইসাথে এসবি’র যে রিপোর্ট – বহু নেতার বিরুদ্ধে এসবি’র রিপোর্ট আছে। কিন্তু আপনারা অবাক হবেন যে, একজন মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৪৮ খানার মতো ফাইল যেখানে ৩০-৪০ হাজার পাতা তাঁর বিরুদ্ধেই লিখেছে। কিন্তু সেই বিরুদ্ধে লেখার মধ্য দিয়েই একদিকে যেমন তাঁর জীবনীটা পাওয়া যায়, অপরদিকে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের অনেক কথা এখানে জানা যায়। সেটাও আমরা তৈরী করেছি, সেটারও কাজ চলছে এবং আমরা এগুলি ডিক্লাসিফাইড করে দিয়েছি।

একটি কথাও কাটিনি, ঠিক সেইভাবেই আছে এবং অনেকে হয়ত বেঁচে নেই, অনেকে বেঁচে আছেন। জানি না তারা এখন পড়লে নিজেরাই লজ্জা পাবে কি-না। আমরা কিন্তু তিনি যাকে যেভাবে দেখেছেন, যেভাবে বর্ণনা দিয়েছেন, সব আমরা ঠিক হুবহু ঐভাবে রেখে দিয়েছি। কারণ সকল মানুষের সত্য কথাটা জানা উচিত। আর এত সাহস আমার নেই যে, আমরা তাঁর লেখায় হাত দেব। কাজেই আমরা আশা করি, সকলেই এই বইটি পড়বেন। (সংক্ষেপিত)

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here