রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের টিকেট বুকিং কাউন্টারে এক বুকিং ক্লার্ককে হত্যা করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। বুকিং ক্লার্কের নাম ইসরাফিল (৬০)। তিনি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে চুক্তিভিত্তিক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন। গতকাল শনিবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে কাউন্টারের কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙ্গে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। এ ঘটনার পর কমলাপুরে রেলওয়ে স্টেশনে ছুটে যান রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। দায়িত্ব অবহেলার জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে ৪ জন রেলওয়ে পুলিশসহ ১০ জন নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেন মন্ত্রী। পুলিশের ধারণা, শুক্রবার গভীর রাতে পরিচিত কোন একটি চক্র পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে হত্যা করতে পারে। পুলিশের রেলওয়ে রেঞ্জের ডিআইজি সোহরাব হোসেন বলেন, পেশাগত কোন অন্তর্দ্বন্দ্বের জের ধরে এ খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। এর সঙ্গে রেলওয়ের কর্মচারীরাও জড়িত থাকতে পারে। এছাড়া ইসরাফিলকে যে কক্ষে খুন করা হয়েছে তার পাশের কক্ষে ট্রেনের টিকেট বিক্রির ২০ কোটি টাকা থাকলেও দুর্বৃত্তরা সেখানে যায়নি।

ঘটনার পর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এলাকায় এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে রেল মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শশী কুমার সিংহকে। এছাড়া প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেল বিভাগ। কমিটিকে ৩ দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

ঢাকা রেলওয়ে বিভাগীয় কর্মকর্তা সরদার সাহাদাত আলী জানান, ভোর ৫টার দিকে বুকিং কাউন্টার মাস্টারগণ টিকিট বিক্রয়ের জন্য কাউন্টারের ভেতর প্রবেশ করতে গেলে মূল কলাপসিবল গেইটে তালা ঝুলানো দেখতে পান। প্রায় ঘণ্টাখানেক ডাকাডাকির পরও কাউন্টারের ভেতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ না পাওয়ায় রেলওয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে রেলওয়ে পুলিশের ওসি আব্দুল মজিদসহ পুলিশের একটি দল কাউন্টারের সামনে আসে। রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার, ম্যানেজার, বাণিজ্যিক কর্মকর্তাসহ কর্মকর্তা কর্মচারীদের উপস্থিতিতে কাউন্টার রুমের প্রথম ও দ্বিতীয় কলাপসিবল গেইটে ঝুলানো তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পুলিশ। ঐ সময় পুলিশসহ রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারীগণ বুকিং কক্ষটিতে ঢুকলে দেখতে পান ইসরাফিল হাত পা বাঁধা, মুখে স্কচটেপ প্যাঁচানো ও গলায় গামছা আটকানো অবস্থায় মেঝের উপরে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন।

কমলাপুর জিআরপি (গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ) থানার ওসি আব্দুল মজিদ জানান, প্রাথমিক ধারণায়, হত্যাকাণ্ডটি অভ্যন্তরীণ। বুকিং ক্লার্ক কক্ষটির ভিতর শুধুমাত্র রেলওয়ে কর্মকর্তা, সহকারী বুকিং মাস্টার, প্রধান বুকিং মাস্টার প্রবেশ করতে পারেন। সাধারণ লোকজন কিংবা পুলিশও কক্ষটিতে ঢুকতে পারে না। কারণ; প্রতিটি কাউন্টারে বিক্রয়কৃত টিকিটের অর্থ এই কক্ষটিতে দায়িত্বরত বুকিং ক্লার্কের কাছে জমা রাখা হয়। কক্ষটি বাহিরের কাউন্টার থেকেও সহজে চোখে পড়ে না। টিকেট কাউন্টারের কক্ষের ভিতর ঢাকা-কলকাতা কাউন্টারের সাথে লাগানো ছোট্ট একটি কক্ষই বুকিং ক্লার্ক কক্ষ হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কক্ষটিতে কলাপসিবল গেট রয়েছে। ওসি বলেন, একটি কাঠের দরজা ও ৩টি লোহার কলাপসিবল গেট পার হয়ে কিভাবে দুর্বৃত্তরা ভিতরে প্রবেশ করলো তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

এ হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসে রেলমন্ত্রী জানান, হত্যাকারীরা শুধু ইসরাফিলকেই হত্যা করেনি, তারা রেলওয়ের প্রায় ১৫ লাখ টাকাও লুট করে নিয়ে গেছে। ঘটনাটিকে অনাকাঙ্খিত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, কখনও ভাবতে পারিনি দেশের প্রধান এ স্টেশনটিতে এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, জড়িতদের শিগগিরই খুঁজে বের করা হবে।

শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নিহত ইসরাফিলের চেয়ারটিতে বসে কাজ করছিলেন বুকিং সহকারী শাহিনুল আলম। তিনি জানালেন, ইসরাফিলের সাথে অনেক বছর ধরে কাজ করছেন, অনেক সত্ ও ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। কাজের প্রতি তিনি অনেক দায়িত্ববান ছিলেন। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পযন্ত তিনি বুকিং ক্লার্কের দায়িত্ব পালন করেছেন। ঐ সময়ে জমা হওয়া ২৩ লাখ ৫৫ হাজার ৫১০ টাকা প্রধান বুকিং মাস্টারের কাছে জমা দিয়ে তার ডিউটি শেষ করেন। রাত ৯ টার দিকে ইসরাফিল আবার আসলে তার কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তিনি চলে যান। তিনি বলেন, রাতে যাদের বুকিং ক্লার্কের দায়িত্ব পড়ে তাদেরকে মধ্য রাত থেকে প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত টাকা গুনে সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে প্রধান বুকিং মাস্টারের কাছে জমা দিতে হয়। ঐ সময় কাউন্টার রুমে নিজস্ব লোক ছাড়া কেউই প্রবেশ করতে পারে না। ৩টি কলাপসিবল ও একটি কাঠের দরজার ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে কাজ করেন তারা।

ঢাকা-কলকাতা কাউন্টারের বুকিং মাস্টার আসমা আক্তার বিউটি বলেন, এ কাউন্টার ও বুকিং ক্লার্ক রুমটি একটি রুমেই করা হয়েছে। মাঝখানে শুধু একটি কাঁচের প্রাচীর। তিনি বলেন, তারা বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যেই চলে যান। এ রুমটিতে বুকিং সহকারী ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেখা যায় না।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সকালে সিআইডির ইন্সেপেক্টর মিজানুর রহমান ও আজাদ এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন। তবে তারা মিডিয়ার সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন বুকিং সহকারী বলেন, শুক্রবার দুপুরের দিকে কাউন্টারের ভেতর টিকিট কালোবাজারি নিয়ে বেশ কয়েকজন ঝগড়ায় লিপ্ত হন। এ সময় রেলওয়ে ডিআরএম সরদার সাহাদাত আলী একজন বুকিং সহকারীর পকেট থেকে ২৫/৩০টি টিকিট জব্দ করেন। এ অপরাধে ঐ বুকিং সহকারীকে তাত্ক্ষণিক সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। দুুপুরে তাকে কাউন্টার থেকে বের করে দেয়া হয়। টিকিট কালোবাজারির ঘটনাটি বুকিং ক্লার্ক ইসরাফিল দেখেছিলেন এবং তিনিই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়েছিলেন।

ডিআরএম সরদার সাহাদাত আলী এ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বুকিং সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে কালোবাজারির টিকিট পাওয়ায় তাত্ক্ষণিক তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং কাউন্টার থেকে বের করে দেয়া হয়। এসময় ইস্রাফিল তার সাথেই ছিলেন। জাহাঙ্গীর আলম কোথায় রয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, এখন কোথায় রয়েছে তা তার জানা নেই।

নিহত ইসরাফিলের মেয়ে ডা. তানিয়ার বক্তব্য

ডা. তানিয়া জানান, শুক্রবার সাড়ে ৮টার দিকে বাবাকে নিজ হাতে ভাত পরিবেশন করেছেন। বাবাই ছিলেন তাদের একমাত্র ভরসা, আশ্রয়ের জায়গা। তিনি বলেন, তার বাবার সত্ লোক হিসাবে অনেক সুনাম রয়েছে। তিনি অন্যায় ও টিকিট কালোবাজারির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। কাউন্টারে থাকা কোনো লোকজনই তার বাবাকে হত্যা করতে পারে বলে তার ধারণা। তাদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর। নিহত ইসরাফিলের দু’মেয়ের মধ্যে তানিয়া ছোট ও তাসলিমা বড় মেয়ে। এদিকে ইস্রাফিলের ১ম জানাজা কমলাপুর রেলওয়ে জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্রামের বাড়ি সিঙ্গাইরে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

১০ জন বরখাস্ত

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রেলওয়ে জিআরপি’র ৪ জন ও রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর ৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কমলাপুর রেলওয়ে জিআরপি থানার এস আই হারুন-অর-রশিদ, কনস্টেবল সালাউদ্দিন, রেজাউল ও সোহাগ। রেলওয়ে নিরাপত্তাবাহিনীর ৬ জনের মধ্যে রয়েছে এ এস আই হাবিবুর রহমান, হাবিলদার হাবিবুর, কনস্টেবল রফিকুল ইসলাম, মাসুদুর রহমান, রফিকুল ইসলাম ও মনির হোসেন। বরখাস্তকৃত সবাই শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত স্টেশনে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।

বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ

বুকিং ক্লার্ক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এ বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা মো. মিয়া জাহান বলেন, আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছি। ট্রেনে আগুন, ইট-পাথর নিক্ষেপসহ নানা সহিংসতা উপেক্ষা করে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচার নিশ্চিত করা না হলে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামবে। সমাবেশে পূর্বাঞ্চল বিভাগীয় কর্মকর্তা সুকুমার ভৌমিকসহ রেলওয়ে কর্মকর্তা কর্মচারী ও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।clark

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here