যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাইকেল ওলফের লেখা ‘ফায়ার এন্ড ফিউরি : ইনসাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ নামের বইটি ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। জনতার নিউজের পাঠকদের জন্য বইটি থেকে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচিত অংশ ভাষান্তর করে প্রকাশ করা হচ্ছে।
 
ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাস হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে প্রচারণা টিমের সদস্য এবং বিভিন্ন কর্মকর্তার যোগাযোগের একের পর এক তথ্য ফাঁসে মহা বিরক্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দৃঢ় বিশ্বাস এর পেছনে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে তিনি অস্ত্র বানালেন টুইটারকে। গত বছরের ৪ মার্চ সকালে হঠাত্ করেই টুইট করতে লাগলেন তিনি। সরাসরি অভিযোগ করে বললেন, বিজয়ের ঠিক আগে ওবামা ট্রাম্প টাওয়ারে আড়ি পেতে ফোনের কথোপকথন রেকর্ড করেছে। এই টুইট করে খুবই উচ্ছ্বসিত ট্রাম্প। কিন্তু পরক্ষণেই সাবেক প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এই অভিযোগকে ‘জাস্ট ননসেন্স’ বলে উড়িয়ে দিলেন। ‘ফায়ার এন্ড ফিউরি:ইনসাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ বইতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
 
বইয়ের ‘ওয়্যারট্যাপ’ অধ্যায়ে লেখক মাইকেল ওলফ লিখেছেন, হোয়াইট হাউসের বেড রুমে তিনটি টেলিভিশন রয়েছে। নিজেই এসব টিভির চ্যানেল ঘোরান। তবে পত্রিকার খবর পড়ার জন্য তিনি নির্ভর করেন হোপ হিকসের ওপর। কনিষ্ঠ সহযোগী হোপ নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পের নিত্যসঙ্গী ছিলেন। সে শুধু কম বয়সী   নন বরং অনেক অনভিজ্ঞও। হোয়াইট হাউসে তার কাজ ছিল পত্রিকায় ট্রাম্প কী কী খবর পড়বেন তা বাছাই করা এবং ইতিবাচকভাবে তার ব্যাখা দেওয়া।
 
কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার পর একটু খোশ মেজাজেই ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু পরদিন ১ মার্চ ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও নিউ ইয়র্কারে যা প্রকাশ করা হলো তা খুবই খারাপ সংবাদ। কিন্তু এগুলোর গুরুত্ব সম্পূর্ণভাবে বুঝে উঠতে সক্ষম হলেন না হোপ হিকস। ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স ওয়াশিংটনে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলিয়াকের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছেন। যখন প্রেসিডেন্টকে এই খবর দেখানো হলো তিনি বললেন, তাতে কী হয়েছে? তিনি এই খবরের গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন না। সেশন্স তো বলেছে তিনি কোনো বৈঠক করেননি। ১০ জানুয়ারি সিনেটে নিয়োগ সংক্রান্ত শুনানিতে সেশন্সের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, আমরা এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত করবো।
 
এসব খবরের পর একটি প্রশ্ন ট্রাম্পের মনে বারবার আসতে লাগলো। কেন কেউ মনে করবে যে রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ খারাপ ছিল? এতে খারাপের তো কিছু নেই। কিন্তু একটি সম্ভাব্য সমস্যা হলো কংগ্রেসের সামনে মিথ্যা কথা বলা। টাইমসের প্রতিবেদনও তাকে বিচলিত করেনি। বরং তিনি বললেন, সেশন্স বলেছে, তিনি প্রচারণা টিমের প্রতিনিধি হিসেবে রুশদের সঙ্গে বৈঠক করেননি। কেস বন্ধ। টাইমেসর খবরে আরো বলা হয়েছিল, মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার প্রচেষ্টা ছিল রাশিয়ার এবং ট্রাম্পের প্রচারণা টিমের সঙ্গে রুশদের সংযোগ ছিল। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবারই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। নতুন প্রশাসনের সুনাম নষ্ট করতে ওবামা প্রশাসন এই রাশিয়া গল্প বানাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার যুক্তি ছিল, আগের প্রশাসনের প্রার্থী হেরেছে। এখন ওবামার লোকজন নতুন প্রশাসনের চলার পথে স্থল মাইন বসানোর জন্য গোয়েন্দাদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করছে। ট্রাম্পের মতের সঙ্গে সব সময় একমত হোপ হিকস। ট্রাম্পের মতে, তথ্য ফাঁসই অপরাধ আর অপরাধীরা হচ্ছে ওবামা প্রশাসনের লোক। মার্কিন বিচার বিভাগ এবং প্রেসিডেন্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, এবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে। ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের অনেকেরই বিশ্বাস ছিলো ওবামার সহযোগী বেন রোডস মূল তথ্য ফাঁসকারী।
 
নিউ ইয়র্কার প্রায় ১৩ হাজার শব্দের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ওইদিন। ওই খবরের শেষদিকে বলা হয়, ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্টের জামাতা কুশনার ট্রাম্প টাওয়ারে রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন, তার সঙ্গে ছিলেন মাইকেল ফ্লিন। এই তথ্যটি হোপের চোখ এড়িয়ে যায় তবে স্টিভ ব্যানন সেটিকে প্রেসিডেন্টের সামনে আনেন। এই খবরের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ তিন ব্যক্তি সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদষ্টা ফ্লিন, অ্যাটর্নি জেনারেল সেশন্স এবং প্রেসিডেন্টের সিনিয়র উপদেষ্টা কুশনারের সঙ্গে রুশ সংযোগের অভিযোগ উঠলো। কুশনার ও তার স্ত্রী ইভানকা ট্রাম্পের বিশ্বাস এই তথ্য স্টিভ ব্যাননই ফাঁস করেছেন।
 
এমন পরিস্থিতি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশন্স মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ বিষয়ে তদন্ত থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেন। এই খবর হোয়াইট হাউসে বোমার মতো ফাটলো। এই তদন্তে সেশন্স ট্রাম্পের রক্ষক ছিলেন। সেশন্সের এটা করার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না ট্রাম্প। তিনি ভাবছিলেন, বরখাস্ত করার মাধ্যমে সেশন্সের হাত থেকে তার মুক্তি পাওয়া উচিত। একইসঙ্গে তার মনে হলো, এখানে কী ঘটছে। রাশিয়া নিয়ে তথ্য কোথা থেকে আসছে সব আমি জানি!’ ওবামার এসব লোকজনকে ছেড়ে দিলে তারা অন্য কিছু নিয়ে সামনে আসবে। তিনি ভাবলেন সব ফাঁস করেই দিতে হবে। ট্রাম্পের মনে হলো, আমলা, গোয়েন্দা, গণমাধ্যম সবাই তার বিরুদ্ধে এক হয়েছে।
 
৩ মার্চ সন্ধ্যার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার অবকাশ যাপন কেন্দ্র মার-এ-লাগো’তে বসে মার্কিন গণ পরিষদের স্পিকার পল রায়ানের সাক্ষাতকার দেখছিলেন। উপস্থাপক ব্রেট বেইয়ার রায়ানের কাছে জানতে চান, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প টাওয়ারে নজরদারির অভিযোগ সম্পর্কে। এটা দেখে পরদিন ভোরেই ট্রাম্প ট্রাম্প টুইট করতে শুরু করেন।
 
ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে টুইট করলেন, ভয়ংকর ব্যাপার! এখন জানা গেল, বিজয়ের ঠিক আগে ওবামা ট্রাম্প টাওয়ারে আড়ি পেতে আমার ফোন রেকর্ড করেছে। কিছুই পায়নি। ৪ টা ৪৯ মিনিটে আরেক টুইটে লিখলেন, এমন আড়ি পাতা একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য কি বৈধ? ৫ টা ২ মিনিটে তৃতীয় টুইটে লিখলেন, পবিত্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ওবামা কীভাবে আমার ফোনে আড়ি পাততে পারেন? এটা হচ্ছে নিক্সন/ওয়াটারগেট। খারাপ (অসুস্থ) লোক!
 
এরপর চিফ অব স্টাফ প্রিবাসকে ফোন করে ঘুম ভাঙিয়ে ট্রাম্প বললেন, তাদের হাতেনাতে ধরেছি! কিন্তু পরে সিএনএন জানায়, সাবেক প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এই অভিযোগকে ‘জাস্ট ননসেন্স’ বলে উড়িয়ে দিলেন। পল রায়ান প্রিবাসকে বললেন, বেইয়ারের প্রশ্নের ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই।
 
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here