borborota১৮ দলীয় জোটের অবরোধ চলাকালে গত শনিবার রাতে সিরাজগঞ্জে যে বর্বর ও নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে, তা মধ্যযুগকেও হার মানিয়েছে। জানা গেছে, ওই দিন অবরোধকারীরা একটি ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে চালক শাহীন, আতাউল ও হেলপার মাজেদুলের শরীরে আগুন ধরে যায়। এ অবস্থায় রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা ট্রাক থেকে লাফিয়ে পড়েন। এ সময় হামলাকারীরা স্বল্পদগ্ধ শাহীন ও মাজেদুলকে ঘাড় ধরে ধাক্কা দিয়ে পুনরায় আগুনে নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে তাদের গায়ে আরো পেট্রোল ঢাললে দাউ দাউ করে আগুন পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওই দুই পরিবহন কর্মীর শরীর ঝলসে যায়। শাহীন (৩০) ও মাজেদুল (৩৫) ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিত্কার দিলে লোকজন ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করে। পরে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিত্সাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার রাত ১১ টার দিকে মারা যান মাজেদুল। ২৪ ঘণ্টা পর গত বুধবার রাতে একই সময়ে মারা যান ট্রাক চালক শাহীন।

জানা গেছে, ঘটনার সময় অপর চালক আতাউল (৩৫) দৌড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে রক্ষা পান। তাকে আর ধরে পুনরায় পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার সুযোগ পায়নি পাষণ্ডরা। অবশ্য তারা কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেছিল। আগুনে তার দুই হাত ঝলসে গেছে। অন্যদিকে ট্রাক চালক শাহীনের শরীরের ৭০ ভাগ এবং হেলপার মাজেদুলের ৯০ ভাগ পুড়ে যায়। আতাউল বর্তমানে বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন। সে ঐ দুই সহকর্মীর দেহে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার দৃশ্য পাশের বাড়ি থেকে লুকিয়ে দেখেছে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার সন্ধ্যায় নওগাঁ থেকে ট্রাক ভর্তি তরকারি নিয়ে চালক আতাউল ও অতিরিক্ত চালক শাহীন এবং হেলপার মাজেদুল রওনা দেন। সিরাজগঞ্জের বানিয়াগাতি এলাকায় আসার পর কয়েকজন তরুণ পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে মুহূর্তেই ট্রাকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দুই চালক ও হেলপারের দেহে আগুন ধরে যায়। তারা লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এ সময় পাষণ্ডরা শাহীন ও মাজেদুলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। দুই হাত উঁচু করে তখন তারা তরুণদের কাছে আকুতি করেছিলেন, ভাইয়া আমাদের পুড়িয়ে মেরো না। আমরা বাঁচতে চাই। আমাদের আয়ের ওপর সংসার চলে। আমরা মারা গেলে স্ত্রী, পিতা-মাতা, ভাই ও বোন-সন্তানরা না খেয়ে থাকবে।’ কিন্তু বর্বররা তাদের আবেদনে সাড়া দেয়নি। তবে তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন এলাকার কয়েকজন সহূদয়বান লোক। তারা দুইজনকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন।

জীবিত থাকাকালে শাহীন ও মাজেদুল এই চরম বর্বরতার কাহিনী কর্তব্যরত চিকিত্সক ও তাদের স্বজনদের কাছে বর্ণনা করেন। এ বর্ণনা শুনে ট্রাক চালক শাহীনের বৃদ্ধ পিতা মো. মকবুল হোসেন ও মা সাহারা খাতুন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। একই অবস্থা হয় হেলপার মাজেদুলের পিতা ইশা মণ্ডলের।

স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও এমন বর্বরতার উদাহরণ নেই বলে বার্ন ইউনিটের কর্তব্যরত চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। জানতে চাইলে ইউনিটের সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, এ নিষ্ঠুর ঘটনা শোনার পর আমার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলার অবস্থা হয়েছিল। এর বর্ণনা দেয়ার ভাষাও আমার জানা নেই।

ট্রাক চালক শাহীনের বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার বাঘাছাড়া গ্রামে। ২ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার বড় শাহীন। এক বছর আগে সেতু বেগমকে বিয়ে করেন শাহীন। গোটা সংসার তার আয়ের উপর নির্ভরশীল। গতকাল বৃহস্পতিবার ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে তার লাশ নওগাঁর গ্রামের বাড়িতে নেয়া হয়। লাশ পৌঁছলে গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। শাহীনের ছোট ভাই শাহাদাত হোসেন  বলেন, আমার ভাই ঘটনার বর্ণনা করে গেছেন। শাহীন বলেছেন, ‘ওরা মানুষ না, নরপশু; ভাই, আমি আর বাঁচবো না, দোয়া করিও।’ এ কথা বলে মূর্ছা যান শাহাদাত।

নিহত হেলপার মাজেদুলের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার উল্লাসপুর গ্রামে। ২ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে সবার বড় সে। তার আয়ের উপর চলতো পরিবার। ছোট বোন সুমি আক্তার  বলেন, তার ভাই মাজেদুল জীবিত থাকাকালে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়ার ঘটনা বলতে বলতে বলে উঠেন, ‘বোনগো আমি আর বাঁচবো না।’ এ কথা বলার এক পর্যায়ে সুমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here