newঅতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে এম কে রহমানের অব্যাহতির পেছনে অন্তত চারটি কারণ আলোচনায় উঠে এেসছে৷ এগুলো হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলির সঙ্গে দ্বন্দ্ব, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় হাইকোর্টে করা রিট আবেদনের শুনানিতে নিষ্ক্রিয়তা৷
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র এই কারণগুলো উল্লেখ করে জানায়, এসব কারণে এম কে রহমান সরকারের আস্থা হািরয়েছেন৷
২০০৯ সালের মার্চে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান এম কে রহমান৷ ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তাঁকে অতিরিক্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ গত সোমবার তাঁকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়৷ গতকাল মঙ্গলবার তিনি ট্রাইব্যুনালের সমন্বয়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, যে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন, ওই আবেদনের শুনানিতে এম কে রহমান রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো যুক্তি দেননি। হাইকোর্টের ওই আদেশে সরকার বিব্রত হয়৷ েখাদ প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জািনয়েছেন৷ সরকারি দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির অবস্থান নিয়ে অনুযোগ করেছেন৷ এরপর তাঁর অব্যাহতির ঘটনা ঘটল৷
জানতে চাইলে এম কে রহমান গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই রিট আবেদনকারীর দরখাস্ত ছিল তদন্ত কমিশন গঠনের৷ তাতে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা চাওয়া হয়নি। তাই সেখানে আমার বলার সুযোগ ছিল না।’
অব্যাহতির কারণ এটা কি না, জানতে চাইলে এম কে রহমান বলেন, ‘তা তো মনে করার কারণ নেই। তবে আদেশের পর আপিল বিভাগে যাওয়ার নির্দেশনা চেয়েছি, তা দেওয়া হয়নি।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলায় সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আসামিপক্ষ পাকিস্তান থেকে সাক্ষী আনার আবেদন করেছিল। শুনানিকালে আসামিপক্ষের ওই আবেদনের জোরালো বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষ।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আসামিপক্ষের ওই আবেদন সমর্থন করার জন্য সাকা চৌধুরীর মামলা পরিচালনাকারী রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের ওপর চাপ দিয়েছিলেন এম কে রহমান। সাকা চৌধুরীর মামলা যেন বিলম্বিত হয়, সে জন্যই ওই আবেদন মঞ্জুর করানোর জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়।
‘প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের একটি সূত্র বলছে, আপনার সঙ্গে জামায়াতের অর্থ লেনদেনের একটা ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে’—একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে এম কে রহমান বলেন, ‘যারা বলেছে তাদের জিজ্ঞাসা করো৷ তারাই ভালো উত্তর দিতে পারবে। মিথ্যার বেসাতির একটা সীমা আছে। প্রশ্নইবা কেন করলে, আমাকে চিনো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘জন্ম, কমিটমেন্ট ও মরালিটি—কতগুলো জায়গায় কমপ্রোমাইজ হয় না। আমার সারা জীবনে এটা করি না। ওই কমিটমেন্টের সঙ্গে, বিচারের সঙ্গে সমঝোতা নেই। বিচার হচ্ছে। বিচার চলমান থাকলে আমার আরও কিছু করার থাকলে আমি সহায়তা করব।’
গত মার্চে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু ও প্রধান সমন্বয়ক এম কে রহমানের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়। আইনে না থাকায় প্রধান সমন্বয়কের নিয়োগ অবৈধ বলে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন গোলাম আরিফ টিপু। পাল্টা বক্তব্যে এম কে রহমান বলেন, তাঁর নিয়োগ বৈধ৷ কারণ সরকার তাঁকে নিয়োগ দিয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্দেশ্যে গত ২৫ মার্চ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের উদ্যোগে রাষ্ট্রপক্ষের সব কৌঁসুলির একটি বৈঠক হয়। সভায় উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষের এক কৌঁসুলি সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা কাকে বিশ্বাস করব? প্রধান সমন্বয়ক এম কে রহমান কোন পক্ষের কো-অর্ডিনেটর, তা আমরা বুঝি না।’
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার আপিল মামলায়ও এম কে রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক সূত্র৷ ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল আবেদনের খসড়া তৈরির কাজ এম কে রহমান কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আপিল শুনানির সব দায়িত্ব অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের ওপর দেওয়া হয়। কাদের মোল্লার আপিল শুনানিতে এম কে রহমান উপস্থিত থাকলেও তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই কম। জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আপিল শুনানির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল একাই চালিয়েছেন। এই মামলায় এম কে রহমানের ভূমিকা ছিল কার্যত শূন্য।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ৭৬টি শূন্য পদে নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এম কে রহমানের বিরুদ্ধে। গত বছরের ২২ আগস্ট দুটি জাতীয় দৈনিকে ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এম কে রহমান নিয়োগ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এমএলএসএসের ৫৭ পদের বেশির ভাগই আগে থেকে পূরণ করে লোক দেখানো পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জেলা কোটা, নারী কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও প্রার্থীর বৈবাহিক অবস্থা উল্লেখ না করায় নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে৷
সংবাদপত্রে খবর হওয়া র্যাবের সাবেক সদস্যদের গ্রেপ্তার, ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগগুলোর সঙ্গে একমত িক না, জানতে চাইলে এম কে রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তো মনে করি না এর কোনোটার সঙ্গে একমত হওয়ার কারণ আছে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে কারও সঙ্গে আমার দ্বন্দ্ব নেই। সেখানে যে দ্বন্দ্ব ছিল, তা সমাধান করতে চেষ্টা করেছি। কখনো কাজ হয়েছে, কখনো হয়নি।’ এম কে রহমান বলেন, ‘আমি কোনো ভুল করিনি। আইনত ও ন্যায়ত যা করার ছিল, তা করেছি।’

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here