গ্রেফতারকৃত  সাত কিলারের লোমহর্ষক বর্ণনা

আবুল খায়েরঃ

একরাম হত্যা

ঘটনাস্থলে উপস্থিত টহল পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। মিশনে অংশ নেয় তিন গডফাদারের ক্যাডাররা

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ার-ম্যান একরামুল হক একরামকে হত্যার মিশন চূড়ান্ত করা হয় এমপি নিজাম হাজারির বডিগার্ড জিয়াউল আলম ওরফে মিস্টার, ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে জিহাদ চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর আব্দুল্লাহিল মাহমুদ শিবলুর তত্ত্বাবধানে। ঘটনার সময় সরাসরি মাঠ থেকে হত্যা মিশন মনিটর করেছিলেন জিহাদ চৌধুরী ও শিবলু। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্র সরবরাহ এবং গুলি করার প্রশিক্ষণ দেন জিহাদ চৌধুরী ও শিবলু। ফেনী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর শিবলু।

এক সময় ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি এবং আলোচিত গডফাদার জয়নাল হাজারীকে দল থেকে বহিষ্কার করার পর তার ক্যাডার ও কিলার বাহিনী বর্তমান এক এমপি ও সাবেক এক এমপির ছত্রছায়ায় তিন ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পরিকল্পনাকারীরা এমনভাবে মাস্টার প্লান করেছে যে ফেনীর তিন গডফাদারের কিলার বাহিনীর সদস্যরা একত্রে একরাম হত্যার মিশনে অংশ নেয়। জানা গেছে, একরাম হত্যাকাণ্ডের আগের দিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ফেনী শহরের সালাম জিমনেশিয়ামের অভ্যন্তরে কিলারদের উপস্থিতিতে জিহাদ চৌধুরী ও কাউন্সিলর শিবলু হত্যাকাণ্ড চূড়ান্ত করেন। এর আগে থেকে একরামকে হত্যা করার জন্য কয়েক দফা বৈঠক করা হয়। ফেনীর মত একটি জেলা শহরে কিলার ও ক্যাডার বাহিনীর আনাগোনা এবং হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসন ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টির বাইরে ছিল কথাটি ফেনীবাসী বিশ্বাস করতে পারছেন না। বর্বরোচিতভাবে একরামকে গুলি করে হত্যার পর তার গাড়িসহ লাশ পুড়িয়ে ছাই করে ফেলার ঘটনা স্মরণকালে ঘটেনি। ঘটনাস্থলে খুনিরা ২০ মিনিট অবস্থান করেছে। ঐসময় পুলিশের একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে টহলদল ঘটনাস্থলের কাছে নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। ফেনী সদর থানা এলাকাটি ঘটনাস্থল। প্রশাসনের বুকের উপর নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডটি দীর্ঘসময় ধরে ঘটানো হলো কিভাবে? এ প্রশ্ন ফেনীবাসীর। একরাম হত্যাকাণ্ডে আগে এবং ঘটনার সময় পুলিশ প্রশাসন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। গ্রেফতারের ব্যাপারেও পুলিশের একই অবস্থা।

র্যাব-১ এর গোয়েন্দা দল ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে একরাম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও প্রথম গুলিবর্ষণকারী আবিদুল ইসলাম ওরফে আবিদসহ ৭ জনকে বারিধারা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এইচ ব্লকের ৫ নম্বর রোডের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত অপর ছয় জন হচ্ছেন জাহিদুল ইসলাম ওরফে সৈকত, চৌধুরী মো. নাফিজ উদ্দিন ওরফে অনিক, কাজী শানান মাহমুদ, মো. সাজ্জাদুল পাটোয়ারী ওরফে সিফাত, মো. শাহজালাল উদ্দিন ওরফে শিপন ও হেলাল উদ্দিন। পরবর্তীতে আবিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একরাম হত্যার অন্যতম কিলার মো. জাহিদ হোসেনকে র্যাব-৭ এর একটি দল গতকাল শনিবার ভোরে ফেনীর রামপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে হেলাল জেনেশুনে একরাম হত্যাকারীদের আত্মগোপনে থাকতে সাহায্য করেছে। র্যাবের কাছে ৭ কিলার একরাম হত্যার পরিকল্পনা, অস্ত্র সরবরাহসহ হত্যা মিশন চূড়ান্ত করার পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেছে।

যেভাবে হত্যার মিশনে খুনিরা অংশ নেয়

আবিদসহ ৭ কিলার জানান, ৫টি গ্রুপে ৪০ জনের অধিক সশস্ত্র ক্যাডার হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। আবিদের ছোট ভাই আবিরের নেতৃত্বে গ্রুপটি উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম ফেনী শহরের বাসা থেকে কখন বের হবেন সেই বিষয়টি ফলো করার দায়িত্ব নেয়। ঘটনাস্থলে হত্যার মিশন চূড়ান্ত করার দায়িত্ব নেয় ৪টি গ্রুপ। ঘটনার আগের দিন ১৯ মে রাতে সালাম জিমনেশিয়ামে বসে জিহাদ চৌধুরী, মিস্টার ও কাউন্সিলর শিবলু কিলার গ্রুপের কার কি দায়িত্ব তা বণ্টন করে দেন। সঙ্গে অস্ত্র, রামদা, লাঠিসহ বিভিন্ন সামগ্রী দেন তিনি। ৫টি মাইক্রোবাস ঘটনাস্থলে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনাকারীরা দেয়। ঘটনাস্থল নির্ধারণ করা হয় শহরের কাছে একাডেমি রোডে বিলাসী সিনেমা হলের সামনের এলাকাকে। এদিক দিয়েই একরাম ফুলগাজী উপজলা পরিষদে যান। দিন ঠিক করা হয় ২০ মে। কিলারদের যার যার গ্রুপ ঘটনাস্থলে গিয়ে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে অবস্থান নেয়। একটি গ্রুপ ফেনী শহরের মাস্টার পাড়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান একরামের বাসভবনের অদূরে অপেক্ষায় থাকে। পৌনে ১১টায় একরাম তিন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে ফুলগাজী উপজেলার উদ্দেশে গাড়িতে উঠেন। আবিরের নেতৃত্বে গ্রুপটি ঘটনাস্থলে অপেক্ষমাণ গ্রুপের নেতৃত্বদানকারীকে ফোনে জানিয়ে দেয় যে একরাম ভাই রওয়ানা দিয়েছে। কিলার গ্রুপের সদস্যরা অস্ত্রসহ যার যার হাতিয়ার নিয়ে প্রস্তুত থাকে। বিলাসী সিনেমা হলের সামনে আসলে একরামের প্র্যাডো গাড়িটিকে নসিমন গাড়ি দিয়ে ব্যারিকেড দেয় তারা। একই সময় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং বোমা ফাটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায় খুনিরা।

ঘটনাস্থলে ৪ গ্রুপের চার ধরনের দায়িত্ব

আবিদ, মানিক ও রুটি সোহেলের নেতৃত্বে কিলার গ্রুপের দায়িত্ব ছিল একরামের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা। সৈকতের নেতৃত্বে গ্রুপের দায়িত্ব ছিল বোমা ফাটিয়ে আতঙ্ক এবং গাড়িটি ভাংচুর করা। জাহিদের নেতৃত্বে গ্রুপের দায়িত্ব ছিল রামদা ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করা। কাজী শানান মাহমুদের নেতৃত্বে গ্রুপটির দায়িত্ব ছিল পেট্রোল ঢেলে একরামসহ গাড়িটি পুড়িয়ে দেয়া। গ্রেফতারকৃতরা এসব তথ্য জানায়। গ্রেফতারকৃত ৭ জনই হত্যা মিশনে অংশ নেয়া ৫ গ্রুপের সদস্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী জিহাদ চৌধুরী শুধু আবিদ, মানিক, পাংকু আরিফ, ছুট্ট, বক্কর, রুটি সোহেল, জাহিদ, সৈকত, সানি, আনিস ও কাজী শানান মাহমুদকে গুলি করে একরামকে হত্যার দায়িত্ব সম্পর্কে আগে নিশ্চিত করে দেয়। আবিদ ও আবিরের মা ফেনী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন ওরফে বড় মনি।

ফেনীর এককালের আলোচিত গডফাদার জয়নাল হাজারিকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের পর তার উত্তরসুরী এক এমপি সেই স্থান দখল করে নেন। জয়নাল হাজারির সাম্রাজ্য পতনের পর সকল ক্যাডার ও কিলার গ্রুপ অপর দুই গডফাদারের অধীনে চলে যায়। এরমধ্যে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এক গডফাদারের উত্থান ছিল লক্ষণীয়। এখন তিনি নিরব। একরাম হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনীর সদস্য বলেও তারা জানিয়েছে।

হত্যার মিশনে অংশগ্রহণকারী শিবলুসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া জড়িত রুটি সোহেল, পাংকু আরিফ, আসিফ, রাকিব, নাঈম, মোহন, মিয়া, বাপ্পি, কাউছার, মিশাল, রুবেল, রাহাত, এমান, রুপুসহ অনেকে পলাতক বলেও তারা জানিয়েছে।

যে কারণে একরামকে হত্যা করা হয়

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আবিদ পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে স্বীকার করেন। আবিদ জানান, ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের গত নির্বাচনে একই উপজেলার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জিহাদ চৌধুরী প্রার্থী হতে দলীয় সমর্থন চেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি একরাম। তিনি জিহাদ চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন না নিয়ে দুবাইতে একরামের ব্যবসায়িক পার্টনার হারুনকে দলীয় মনোনয়ন দেন। হারুন আনন্দপুর ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এ নিয়ে দ্বন্দ্বে জিহাদ চৌধুরীকে একরাম দল থেকে বহিষ্কার করেন। জিহাদ চৌধুরী এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এক এমপি, বিএনপির ঐ আমলের গডফাদার ও কাউন্সিলর শিবলুর সঙ্গে হাত মিলায়। উপজেলার সরকারি আর্থিক বরাদ্দে টেন্ডারসহ বিভিন্ন কাজের কমিশন বাবদ পেতেন ২৫ ভাগ। উপজেলার চেয়ারম্যানগণ ৭৫ ভাগ ভাগাভাগি করে নিতেন। ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এক এমপি নির্বাচিত হয়ে ৭৫ ভাগ কমিশন নিতে হবে বলে ঘোষণা দেন। একরামের সঙ্গে শুরু হয় এমপির দ্বন্দ্ব। এ সুযোগ নেন জিহাদ চৌধুরী। এমপির সায় নিয়ে জিহাদ চৌধুরী কাউন্সিলর শিবলু ও এমপির বডি গার্ড মিস্টারের সমন্বয়ে একরাম হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। তদন্তে ও গ্রেফতারকৃতদের তথ্য প্রমাণে এসব তথ্য বের হয়ে আসে।

ফেনী সদর থানার পুলিশ গতকাল একরাম হত্যায় র্যাবের হাতে আটক আটজনকে গ্রেফতার দেখায়।

শিবলুর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ

ফেনী প্রতিনিধি জানান, গতকাল শনিবার দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটের সময় পৌর ৫ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ৫ নং ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু ফেনীর মডেল থানায় এসে অফিসার ইনচার্জ মাহবুব মোর্শেদের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। ফেনীর পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ দ্রুত খবর পেয়ে ফেনী মডেল থানায় আসেন এবং সাংবাদিকদের নিকট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, একরাম হত্যায় আমাদের সন্দেহের তালিকায় যারা রয়েছে তাদের মধ্যে শিবলু অন্যতম। উল্লেখ্য যে ঢাকায় একরাম হত্যায় জড়িত সন্দেহে র্যাব ৮ জনকে গ্রেফতারের পর ফেনী থানা পুলিশ একটু মানসিক চাপে পড়ে। কারণ শিবলু সারাদিন শহরে চলাফেরা করেছে এবং পৌরসভায় ছিল। ঢাকায় র্যাবের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর সে র্যাবের হাত থেকে বাঁচার জন্য ফেনী থানায় এসে আত্মসমর্পণ করে।

পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, ফেনী সদরে একরাম হত্যাকাণ্ডে আগে পরে কিংবা ঘটনার সময় পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে অবহেলা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয় তদন্ত কার্যক্রম চলছে বলে আইজিপি জানান।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here