Nusratমায়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে আছে বছর দুইয়ের ছোট্ট নুসরাত। মুখে গুটি বসন্তের মতো লাল দাগ। ফ্রকে লেগে আছে রক্ত। মায়ের পোশাকেও সেই রক্তের চিহ্ন। ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে একদিকে। নির্বাক। এখনো বুঝে উঠতে পারছে না তার শরীরে রক্ত কেন? কী অপরাধ তার। কেন তাকে রক্তাক্ত হতে হলো। ঘরেই তো বসেছিল। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনার আকস্মিতায় হতবিহ্বল মা রোখসানা আকতারও। চিত্রটি গত সোমবারের। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৬০ ঘণ্টা হরতালের দ্বিতীয় দিনে হাটহাজারীর বাস স্টেশন এলাকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষে আহত হয় মা-মেয়ে। তাঁরা ছিলেন রাস্তার পাশের তিন তলার বাসার বারান্দায়।

ঘটনার পর থেকে মুখে খাবার তুলছে না নুসরাত। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরার পরও শত চেষ্টায় মেয়ের মুখে কিছু দিতে পারেননি রোখসানা। আঘাতে মুখ ফুলে গেছে নুসরাতের। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে ছোট্ট শরীরটি। শুধুই কান্নাকাটি করে চলেছে। ভয়ে জড়সড় অবস্থা। রোখসানার নিজেরও আতঙ্ক কাটেনি এখনো। কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। শেষে আবার কী হতে কী হয়ে যায়—এই আশঙ্কা পরিবারটির সবার চোখেমুখে। কারণ, স্বামী প্রবাসী। দুই মেয়ে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। তাই বাড়তি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না।

কী ঘটেছিল সেদিন: ২৮ অক্টোবর, বিকেল সাড়ে পাঁচটা। বাস স্টেশন এলাকার ওয়াদুদিয়া মাদ্রাসার পাশের ভাড়া বাসার বারান্দায় শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে নুসরাতকে নিয়ে বসে ছিলেন রোখসানা। হঠাৎ কানে লাগে বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। চারদিকে ধোঁয়ায় আছন্ন হয়ে যায়। এরপর রোখসানা দেখেন তাঁর শরীরে রক্ত। কোলে থাকা নুসরাতের মুখ লাল। গায়ে রক্ত। বাসার বারান্দার পর্দা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। কাতরাচ্ছে মা-মেয়ে। তাঁদের অবস্থা দেখে পাশের বাসার পল্লি চিকিৎসক সুজিত দাশ এসে উদ্ধার করেন। তিনি প্রথমে তাঁদের হাটহাজারীর বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর আনা হয় চমেক হাসপাতালে। অবশ্য মেয়েকে নিয়ে পরদিন বাসায় চলে যান রোখসানা।

নুসরাতের দাদি মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘গদির জন্য তারা মারামারি করছে। আর মরছি আমরা। আমাদের কী অপরাধ। আমরা তো কোনো কিছুতে নেই। বাসায় বসেছিল আমার নাতনি। তার পরও তার গায়ে এসে লাগল গুলি। এখন নুসরাত কিছুক্ষণ পরপর ডুকরে কেঁদে উঠছে।’

চিকিৎসকেরা জানান, নুসরাতের আঘাতটা তেমন গুরুতর নয়। শরীরে স্প্লিন্টার বিঁধেছে। তবে তা সেরে যাবে। কিন্তু শরীরের আঘাতের চেয়েও তার মনের আঘাতটা গুরুতর। সেটা সারতে সময় লাগবে।

মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, এই আঘাত শুধু শারীরিক নয়, তার মনকেও রক্তাক্ত করেছে। যার দীর্ঘস্থায়ী একটা প্রভাব পড়বে তার জীবনে। প্রথম চার সপ্তাহে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নে হানা দেবে ঘটনাটি। পুলিশের পোশাক দেখলে আঁতকে উঠবে। সে কখনো হতবাক, কখনো নির্বাক হয়ে যেতে পারে। নিজেকে গুটিয়ে নেবে। চার সপ্তাহ পর তার স্থায়ী উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা ও মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হবে। সে ঘর থেকে বের হবে না। ঘটনাটা মনে পড়লে তার মধ্যে একধরনের যাতনা তৈরি হবে। সব উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে সে। এ জন্য তাকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। পাশে দাঁড়াতে হবে আপনজনকে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here