newমেহেদী হাসানঃ-

আমরা মুসলীম হিসেবে সকলের দায়ীত্ব ও কতর্ব্য হল রাস্ট্রের বিচার ব্যবস্থাকে মেনে নেয়া , সেটা আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক । বিচারপতিরা কখনই নিজেদের ইচ্ছামত রায় দেননা, তারা বিবেকবান তারা ন্যায়মূর্তি । তাদের উপর আল্লাহর অসীম নিয়ামত রয়েছে , তারা ইচ্ছা করে নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্থ করতে পারেনা । বিচারককে হাকিম বলা হয়, যা আল্লাহ আসমাউল হুসনা নামগুলোর একটি । বিচারকের উপর কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির অনাস্থা জ্ঞাপন কোন সুযোগ কোনকালেই নেই । ইসলামেও তা ছিলনা। আর তাই বিচাকরের মান অত্যন্ত উঁচু করে দেয়া হয়েছে ।
এক হাদিসে আছে, ‘হযরতা আমর ইবনে আস (রা) কর্তৃক বর্ণিত । তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছেন, যদি কোন বিচারক যথাযথ চিন্তা-গবেষনার পর রায় প্রদান করতে, এর পর তিনি সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হোন, এর জন্য দুটি পুরস্কার রয়েছে । আর যদি তিনি চিন্তা-গবেষণা করে রায় প্রদানে ভুল করেন, তবুও তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার ।‘

-সহীহ মুসলিম শরীফ (৪৩৫৩) ।

অর্থাৎ শরীয়তে বিচারকের স্থান এতই উঁচু যে তার রায়কে অমান্য করা কোন মতেই জায়েজ এই, কারণ কোন বিচারপতিই সাধারণ ব্যক্তি হোননা । রায় যে কারও বিপক্ষে যেতেই পারে , বিশেষ করে অপরাধীর ত শাস্তি হবেই । শাস্তি মেনে নেয়া খাঁটি মুসলীমের কাজ, আর এতে করে ঐ পাপীর গুনাহ মাফ হতে পারে । দুনিয়াতে পাপের জন্য শাস্তি পেলে আখিরাতে তার সাজা কোম হবে , এমনকি আল্লাহ তা’লা সুবহানাহু তাকে মাফ করতে পারেন , কিন্তু শাস্তি বিনা কোন অপরাধীর মাফ হবেনা ।
অনেকেই মনে একটা ধারণা পোষণ করে থাকেন, এমন সন্মানিত ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া কি ইসলামের দৃষ্টিতে ঠিক হচ্ছে ?? আমরা যখন ইসলামের কথা বলি তখন ইসলামকে নিয়েই চিন্তা করতে হবে । আমার ধারণা বা আপনার ধারণা ইসলাম নয়,

ইসলামে কি বিধান আছে তা দেখুন ।

হাদিস: “হযরত আয়েশা (রা ) থেকে বর্ণিত যে, উসামা (রা) জনৈকা মহিলার চুরির ব্যপারে নবী করীম (সা) এর কাছে সুফারিশ করলেন । তখন তিনি বললেন: তোমাদের পূর্ববর্তী সম্প্রদায় সমূহ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে । কারণ, তারা নিন্মশ্রেণীর লোকদের উপর শরীয়তের শাস্তি কায়েম করত । আর মর্জাদাবান লোকদেরকে রেহাই দিত । ঐ মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন, মা ফাতিমাও যদি এ কাজ করত, তাহলে অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দিতাম । “–বুখারী শরীফ ।

তাহলে কি দাঁড়াল ? কোন এমপি, মিনিস্টার , কোন আওলিয়া, কোন পীর ফকিহ, কোন দরবেশ , কোন ওয়াজিয়ান , কোন মওলানার জন্য কি শাস্তি কোম ?? …

তারা কি মা ফাতেমার চাইতেও বড় ? যে মা ফাতেমা বেহেস্তের সরদারিনী , স্বয়ং রসূল (সা) এর মেয়েকে উপমা দিয়ে শাস্তির বিধানে যখন শাস্তির ক্ষেত্রে ভেদাভেদ না করতে । তখন বর্তমানে যাদের বিচার চলছে তাদের কোন যুক্তিতে বলা হয় নি:শর্ত মুক্তি দিতে হবে ?? অথবা কোন যুক্তিতে শিবিরের পক্ষথেকে হুমকি দেয়া হয়েছিল ‘সাঈদী অতি জনপ্রিয় ব্যক্তি তাকে ফাঁসি না দেয়ার জন্য সরকারের কাছে আহবান জানাই , যদি তার ফাঁসি হয় তবে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে । দেশে শান্তি শৃংখলা বলতে কিছু রাখা হবেনা ।‘ ??? কেন যে কোন রায়ের পর একের পর এক হরতাল চলে ? বিচারকের রায়ের বিরুদ্ধে কি হরতাল দেয়া ইসলামে জায়েজ আছে ? নাকি কোন দেশের রাস্ট্রীয় বিধানে অনুমতি আছে ??

রাস্ট্র যখন যে বিধান করে তা মান্যকরা মুসলীমদের কাজ । রাস্ট্রপধানের হুকুম বা জারীকৃত বিধান সবাইকে মেনে নিতে হবে । এটা শরীয়তের বিধান । যদি তাই হয় তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন কেন রাস্ট্রীয় বিধানের হওয়ায় তা জামায়াত মানতে নারাজ ??

হাদিস: বিষয়: রাস্ট্রপধানের হুকুম শোনা ও আনুগত্য করা জরুরী:

‘হযরত আব্দুল্লাহ (রা) কর্তৃক বর্নিত, তিনি বলেন, হযরত নবী করিম (সা) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলীম ব্যক্তির জন্য রাস্ট্রপ্রধানের নির্দেশ শোনা ও আনুগত্য করা একান্ত কর্তব্য । যতক্ষণ না তাকে নাফরমানীর নির্দেশ দেয়া হয় । সে নির্দেশ তার পছন্দ কিংবা অপছন্দই হোক, কিন্তু যদি তার প্রতি নাফরমানীর হুকুম দেয়া হয়, তখন তা শ্রবণ করবে, অনুগত্য করা আবশ্যক নয় ।‘ .. বুখারী শরীফ (হাদিস নং ৬৬৫৯)

তাহলে, দেশে যে গণহত্যার বিচার করা হচ্ছে , যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে তার বিরোধীতা করা কি কোন মুসলীমের লক্ষণ বলে মনে হয় ?? শুধু এই বিচারকে অবজ্ঞা করাই নয়, বিচার যাতে না হয়, যাতে বিদেশ থেকে খ্রীষ্টান বন্ধুরা চাপ দেন সেজন্য ২৫০ কোটি টাকা মীর কাসেম ঢেলেছেন , লবিষ্ট নিয়োগ করেছেন । এটি কি কোন মুসলীমের লক্ষণ ??
ধর্মের নামে পার পাবার সকল ব্যবস্থা করেও তাদের পার হবেনা, কেননা বিচার স্বয়ং আল্লাহ তা’লা চান , আর অপরাধ চায় শয়তান । অপরাধ করিয়ে নিয়ে শয়তান খুশি হয়, বিচার থেকে দায় মুক্তি দিয়ে , বিচার না করাতে শয়তান উৎসাহ দেয় ! কিন্তু আল্লাহ তা’লা সব সময় বিচারের পক্ষে আর অন্যায়ের বিপক্ষে । আল্লাহ তা’লা সব সময় মাজলুমের পক্ষে ।

যারা বলেন হত্যার জন্য আমাদের নেতাদের শাস্তি দেয়া যাবেনা , সেই সব নেতারা জেনে রাখুন ইসলাম বলে হত্যার বদলে হত্যা , আর খুনের বদলে খুন । যে ব্যক্তি যেভাবে অপরাধ করেছে তাকে সেভাবেই শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে । এটাই ইনসাফ । একটা দেশে শান্তি ও রহমাত তখনই খোদার পক্ষ্ থেকে বর্ষীত হয় যখন সেদেশে হত্যার বিচার হয়, মুজরিমরা ইনসাফ পায় । আর অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হয় । অপরদিকে একটি দেশে তখনই গজব নাজিল হয় , রহমত উঠে যায় , যখন রাস্ট্রকর্তৃক অপরাধীকে বাঁচানো হয় , যখন রাস্ট্রকর্তৃক বিচার বন্ধ করা হয় । যখন মুজরীমের কাঁন্না রাস্ট্রের কর্তাব্যক্তির কানে পৌছেনা ।

হত্যার শাস্তি ইসলামে কি বিধান আছে দেখা যাক :

হাদিস: হযরত সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন ‘কোন ব্যক্তি নিজের গোলামকেও যদি হত্যা করে আমরা তাকে হত্যা করব । আর কোন ব্যক্তি তার নিজের (অনুগত) গোলামের কোন অঙ্গ কেটে ফেললে , আমরাও তার অঙ্গ কেটে ফেলব….।…’ (তিরমিজী শরীফ-১৩৫৪)
অপর হাদিস: ‘তিনটি অপরাধের দরুণ একজন মুসলীমকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যায় ।
১. বিবাহিত হয়েও ব্যভিচার করলে ।
২. কোন ব্যক্তিকে হত্যা করলে ।
৩. নিজ ধর্ম (ইসলাম) ত্যাগ করলে ।‘… তিরমিজী শরীফ – ১৩৪২ .

*অপর হাদিস: “হযরত আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, রোজ কিয়ামতের দিন বান্দাদের মধ্যে সর্বপ্রথম খুনের বিচার করা হবে । … তিরমিজী শরীফ – ১৩৪৫ ।
এ থেকেই বোঝা যায় হত্যা কতবড় জঘণ্য অপরাধ । আর উপরের বর্ণিত হাদিসের ভিত্তিতে বিচার করলে বর্তমান মানবতা বিরোধী অপরাধীরা হত্যা খুন , ধর্ষণ (ব্যাভিচার) করেছে । যা ধর্মীয় দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত । আর এহেন অপরাধের বিচার করা শুধুমাত্র রাস্ট্রেরই দায় নয় , ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেও দায় রয়েছে ।

ইসলামী দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ :

এক হাদিসে আছে ‘রসূল (সা) যুদ্ধকালিন সময়ে যেসকল বিষয় নিষিদ্ধ করেছেন তার মধ্যে , ১. শত্রুদের খেজুর গাছে আগুন না লাগানো, বা আগুন লাগিয়ে গাছ পোড়ানো নিষিদ্ধ । ২. শিশুদের ও নারীদের হত্যা না করতে । ৩. বয়স্ক ব্যক্তিদের হত্যা না করতে । ৪. যুদ্ধবন্দীদের রাস্ট্রীয় বিধানে বাহিরে হত্যা না করতে ।‘ আর এগুলো করা হল যুদ্ধকালীন অপরাধ । যাকে আমরা যুদ্ধাপরাধ বলতে পারি ।
আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধীরা যুদ্ধক্ষেত্রে এসব কাজই করেছেন, খেজুর গাছ পোড়ানো নিষিদ্ধ , অথচ রাজাকারেরা মানুষের ঘরবা[ড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে , নারীদের ধর্ষণ করেছে, শিশুদের হত্যা করেছে , হত্যা করেছে বৃদ্ধদের । যুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরতে পারলে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে । বুদ্ধিজীবি হত্যা করেছে ।… আসলে অপরাধ সব ক্ষেত্রেই অপরাধ তা আমাদের দেশের মত গণতান্ত্রিক দেশেই হোক বা ইসলামের শরীয়তে । অপরাধীর বিচার হতেই হবে ।
আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধীদের যে সকল বিষয় নিয়ে বিচার চলছে তাদের মধ্যে ইসলামে যুদ্ধক্ষেত্রে যেসকল বিষয় নিষিদ্ধ সে সকল বিষয়ই , তাই আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ইসলামী দৃষ্টিতেই হোক আর রাস্ট্রীয় দৃষ্টিতে , বিচার না মেনে কোন উপায় নেই । বিচারকে মানতেই হবে ।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here