1383850042.ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের দেহের নমুনায় পোলোনিয়াম বিষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই তেজস্ক্রিয় পদার্থটি এতটাই বিষাক্ত ও ধ্বংসাত্মক যে মাত্র এক গ্রাম পোলোনিয়ামের কারণে এক কোটির বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। পোলোনিয়া খুবই দুর্লভ এবং অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ। এটি সাধারণত ভূ-ত্বকের ওপরে পাওয়া যায়। বিশ্বখ্যাত নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী মারি কুরি বিগত ১৯ শতকে এই পদার্থটি আবিষ্কার করেন। তার জন্মস্থান পোলান্ডের ল্যাতিন নাম পোলোনিয়া অনুসারে এর নাম রাখেন পোলোনিয়াম। পোলোনিয়ামের ডজনখানেক আইসোটোপ রয়েছে। এর মধ্যে পোলোনিয়াম-২১০ নামক আইসোটোপের মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে তেজস্ক্রিয় আলফা কণা। আলজাজিরা বলছে, তাদের প্রাথমিক তদন্তে আরাফাতের শরীরে এই আইসোটোপটির সন্ধান মিলেছে। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা।
প্রচ- তেজস্ক্রিয়তার জন্য পোলোনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্রের ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও চাঁদে অবতরণ করা নভোযান গরম রাখতে রাশিয়া ১৯৭০ সালে পোলোনিয়াম ব্যবহার করে। শরীরের ভেতরে ঢুকার পরই পোলোনিয়ামের ভয়াবহ ক্ষমতা সক্রিয় হয়। বিবিসি জানায়, সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা বলছেন তারা ইয়াসের আরাফাতের দেহাবশেষ গবেষণার পর তার হাড়ে বিষাক্ত পোলোনিয়ামের সন্ধান পেয়েছেন। প্যারিসের একটি হাসপাতালে ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর মারা যান ইয়াসের আরাফাত। তখন মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কিন্তু তাকে হত্যা করা হয়েছে এমন বিতর্ক বেশ কিছুদিন ধরে চলে আসছিল।
বিষপ্রয়োগে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এমন সন্দেহ ওঠায় মৃত্যুর প্রায় আট বছর পর ইয়াসের আরাফাতের দেহাবশেষ কবর থেকে ২০১২ সালে তোলা হয়েছে। এক বছর তাতে গবেষণার পর সুইস বিজ্ঞানী বলছেন তার হাড়ে যে পরিমাণ পোলিনিয়াম নামে একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া গেছে তা মানবদেহের স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে ১৮ গুণ বেশি।
দেহাবশেষ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সব নথি পরীক্ষার পর সুইজারল্যান্ডের গবেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনি নেতার দেহে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ পোলোনিয়ামের অস্তিত্ব ছিল। সুইস গবেষকদের প্রতিবেদন হাতে পেয়ে আল জাজিরা গত বুধবার এই খবর ছাপিয়েছে, যার ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে ইয়াসির আরাফাতের স্ত্রী সুহা প্যারিসে রয়টার্সকে বলেছেন, এখন আর সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রমাণ হল, এটা ছিল হত্যাকা-।
ইয়াসির আরাফাতের দেহে পাওয়া পোলোনিয়াম-২১০ সাধারণ খাবারের মধ্যে স্বল্পমাত্রায় থাকে, মানবদেহেও প্রাকৃতিকভাবে এর অস্তিত্ব থাকতে পারে। তবে অতিমাত্রায় দেহে প্রবেশ করালে তা মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। শুরু থেকেই অনেক ফিলিস্তিনিদের সন্দেহ ছিল, তাদের নেতাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় এবং এর পেছনে ইসরাইলের হাত রয়েছে। তবে এর আগে হত্যার কয়েকটি ষড়যন্ত্রের তথ্য ছাড়া এই সন্দেহের পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ ছিল না। আর ইসরাইলও এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। আরাফাতকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে বলে আল জাজিরার এক প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হলে নতুন করে তা নিয়ে আলোচনা ওঠে। এর রেশ ধরে গত বছর ফিলিস্তিন ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ইয়াসিরের দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে আবার পরীক্ষা চালানোর কাজ শুরু হয়।
এই পরীক্ষায় অংশ নেয়া সুইস বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়, তার শবদেহে অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা প্রকারান্তরে বিষপ্রয়োগের ইঙ্গিত দেয়। মৃত্যুর প্রায় আট বছর পর অনুসন্ধান কাজ শুরু করার কারণে অনেক আলামত চিহ্নিত করা দুরূহ ছিল- তা স্বীকার করে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন বলেও জানান গবেষকরা।
ইয়াসিরের দেহাবশেষ তোলার পর রাশিয়া ও ফ্রান্স এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালায়। তবে রুশ গবেষক দল গত মাসে জানান, তারা পোলোনিয়ামের কোনো অস্তিত্ব পাননি। সুহা আরাফাত সুইস গবেষকদের প্রতিবেদন পেয়ে আরো বলেন, এটি একটি সাচ্চা অপরাধ, একটি রাজনৈতিক হত্যাকা-। এই প্রতিবেদন আমাদের সব সন্দেহ দূর করেছে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটা প্রমাণ হয়েছে যে, তার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। তাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকা-ের পেছনে কারা ছিল- সেই বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি সুহা। তবে বলেছেন, তার স্বামীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে অনেক শত্রু ছিল।
আরাফাত ৩৫ বছর ধরে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় দলগুলোর মূল সংগঠন ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলও’র নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে পশ্চিমতীরে নিজের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৭৫ বছর বয়সি আরাফাত। এর দুই সপ্তাহের মাথায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফ্রান্স নেয়া হয়। ওই বছর ১১ নভেম্বর তার মৃত্যু হয়।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here