image_85696
প্রতিদিন ফুটপাতে ফল বিক্রি করে যা পাই। তা দিয়ে চাল, ডাল, তেল, লবণসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়। এগুলো কিনে বাসায় ফেরার পরই স্ত্রী ও সন্তানদের মুখে খাওয়া উঠে। যে দিন ফল বিক্রি করতে পারি না, সেদিন বাসায় চুলা জ্বলে না। পরিবারের সদস্যদের না খেয়ে থাকতে হয়। এখন তো অসুস্থ শরীরে আর ফল বিক্রি করতে পারবো না। এখন আমার তিন মেয়ে ও স্ত্রীর কি হবে? তারা কিভাবে চলবে? কি খেয়ে বাঁচবে?’

ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটের একটি ওয়ার্ডে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিবেদকের কাছে প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দিলেন অগ্নিদগ্ধ ফল বিক্রেতা খবির উদ্দিন (৪০)। গত মঙ্গলবার হরতাল চলাকালে রাজধানীর রায়েরবাগে বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সেখানে দগ্ধ ৯ যাত্রীর মধ্যে খবির একজন। আগুনে তার মুখমন্ডল ও শরীর ঝলসে গেছে। কিন্তু হরতালের আগুন শুধু তাকেই পোড়ায়নি, পুড়িয়েছে তার পরিবারের ভবিষ্যত্ও। আগামী দিনে সংসার কিভাবে চলবে-তা নিয়ে এখন চিন্তিত এই ফল বিক্রেতা।

গতকাল বুধবার বার্ন ইউনিটে বসে কথা বলার সময় খবিরের শয্যার পাশে বসে ছিলেন স্ত্রী তানিয়া ও ১৪ মাসের শিশু কন্যা মরিয়ম। কথা বলার এক পর্যায়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে খবির চিত্কার করে বলে উঠেন, ‘মারে, তোদের এখন কি অবস্থা হবে!’ খবিরের এমন আহাজারিতে ওয়ার্ডের অন্য রোগী ও দর্শণার্থীদের চোখও ভিজে ওঠে।

ডেমরা মুক্তি সরণির রায়েরবাগের ফুটপাতে বসে ফল বিক্রি করতেন খবির। ওইদিন ফল বিক্রি করে বেলা ২টার দিকে চাল, ডালসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে কোমল পরিবহনের একটি বাসে উঠেন। সিটে বসার কিছুক্ষণ পর হঠাত্ যাত্রীরা ‘আগুন, আগুন’ বলে চিত্কার দেয়। মুহূর্তে আগুন বাসটিতে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় খবির উদ্দিন ও ইডেন কলেজ ছাত্রী রাবেয়া সুলতানাসহ ৯ বাসযাত্রী কমবেশি দগ্ধ হন। বাসটিতে গান পাউডার দিয়ে পিকেটাররা আগুন লাগিয়ে দেয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে খবির বলেন, ঘটনার পর কোথায় যাবেন, তার পরিবারের সদস্যদের কি হবে- এসব ভাবতে ভাবতে দগ্ধ শরীর নিয়ে তিনি দিকবিদিক হারিয়ে ফেলেন। সঙ্গে ছিল পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনা চাল, ডাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। নিজে দগ্ধ হলেও সেগুলো তিনি ঠিকমতই রক্ষা করেছেন। পরে দগ্ধ শরীর নিয়েই সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় উপস্থিত হন খবির। তাকে দেখে স্ত্রী ও সন্তানরা কাঁদতে শুরু করেন। আশেপাশে বাসিন্দারা ছুটে আসেন বাসায়। এক পর্যায়ে তিনি সজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে রাতেই প্রতিবেশীরা তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে ভর্তি করার পর শুরু হয় তার চিকিত্সা।

পোড়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডা. শামন্ত লাল সেন বলেন, আগুনে খবিরের দুই হাত, মুখমন্ডল ও দেহের উপরিভাগ ঝলসে গেছে। গতকাল থেকে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে, তবে তিনি একবারে আশংকামুক্ত নন।

এদিকে খবিরের মত একই অবস্থা বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন স্বর্ণকার মন্টু পাল (২৫) ও আবুল কাশেমের (৫০)। দুজনের অবস্থাই আশংকাজনক বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন।

গত রবিবার রাতে হরতালের সময় পিকেটাররা পুরনো ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে লেগুনা গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে মন্টু পালের সমস্ত শরীর ঝলসে যায়। স্ত্রী সঞ্জু পাল জানান, তার স্বামী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্বামী কাজ না করতে পারলে হয়তো তাদের না খেয়ে থাকতে হবে।

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাটে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পেট্রোল বোমার বিস্ফোরণে আহত হন নিরীহ কৃষক আবুল কাশেম। তারও সমস্ত শরীর ঝলসে গেছে। কাশেমের বড় ছেলে কাওসার জানান, বাবাকে নিয়ে তাদের ৩ ভাই ও ২ বোনের সংসার। পিতার আয়ের উপরই তারা চলেন। এখন তাদের কি হবে? নিজেদের ভবিষত্ নিয়ে তাই তারা শংকিত। কথা বলার এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এই তরুণ।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here