istema

news

পরম করুণাময়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দুই হাত উঠালেন লাখ লাখ মুসল্লি। গোটা বিশ্বের মুসলমানদের সুদৃঢ় ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সমৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ববাসীর জন্য তারা কামনা করলেন মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ। অবুঝ শিশু থেকে শুরু করে নবতিপর বৃদ্ধ—কায়মনোবাক্যে সবার একই আকুতি। আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্যও রাব্বুল আলামীনের দরবারে বিশেষ রহমত প্রার্থনা করেন সবাই। অনেকেই এ সময় চোখের জলে বুক ভাসান।

টঙ্গীর তুরাগ তীরে এভাবেই আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার শেষ হলো তাবলীগ জামাত আয়োজিত ৫০তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন বিশ্ব তাবলীগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বি ভারতের হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ। তিনি আরবি ও উর্দু ভাষায় মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে দেশ-বিদেশের আনুমানিক ৩০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেন বলে ইজতেমা আয়োজকসহ সংশ্লি­ষ্ট সূত্রের ধারণা। তবে অবরোধের কারণে এবার গত বছরের চেয়ে মুসল্লির সংখ্যা কম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও গুলশানের দলীয় কার্যালয় থেকে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

বেলা ১১টা ১৭ মিনিটে শুরু হওয়া মোনাজাত চলে ১১টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত। এ সময় ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনিতে প্রকমিপত হয় গোটা ইজতেমাস্থল ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। মোনাজাতে অংশ নিতে গতকাল ভোর হতে চারপাশ থেকে লাখ লাখ মুসল্লি হেঁটেই ইজতেমাস্থলের দিকে পৌঁছান। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পরে মুসল্লিরা মাঠের আশ-পাশের রাস্তা, অলি-গলিতে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মুসল্লি আশুলিয়া, কামাড়পাড়া সড়ক, ঢাকা-কালীগঞ্জ সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী বাসা-বাড়ি, কলকারখানা-অফিস, দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন।

আখেরি মোনাজাতের জন্য গতকাল আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোন কোন প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা না করলেও তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না।

বিশ্ব ইজতেমায় আগত লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে ইজতেমা ময়দানের পূর্ব পাশে শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার স্টেডিয়ামে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি, স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল ইসলাম, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ পিপিএম প্রমুখ।

মোনাজাতে যা বলা হল

মোনাজাতে মাওলানা সা’দ বলেন, হে আল্ল­াহ আমাদের অন্তর থেকে কুফরি, মোনাফেকি দূর করে দাও। হে আল্লাহ, তোমার নির্দেশিত পথে চলার তৌফিক দাও। হে আল্লাহ, আমাদের সকল নেক চাহিদা পূরণ করে দাও। হে রাহমানুর রাহীম আমাদের ওপর রহম করো। আমাদেরকে রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি দাও। আমাদের ওপর দয়া করো যেভাবে তুমি তোমার নেক বান্দাদের ওপর রহম করেছ। হে আল্লাহ, আমাদের পরিপূর্ণ ঈমান দাও। তোমার আজাব থেকে পরিত্রাণ দিয়ে জান্নাত নসিব করো। জাহান্নামের আগুন আমাদের জন্য হারাম করে দাও। কায়মনোবাক্যে আকুতি জানিয়ে মোনাজাতে আরো বলা হয়, হে আল্লাহ, তুমি তো ক্ষমাশীল, তোমার কাছেইতো আমরা ক্ষমা চাইব। দীনের উপর আমাদের চলা সহজ করে দাও। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আমরা যেন তোমার সন্তুষ্টিমাফিক চলতে পারি সে তওফিক দাও। দুনিয়ার সকল বালা-মুসিবত থেকে আমাদের হেফাজত করো। ইজতেমাকে কবুল করো। ইজতেমার আয়োজনে যারা শ্রম দিয়েছে তাদের কবুল করো। যারা তোমার কাছে হাত তুলেছে সকলকে তুমি কবুল করো। ইজতেমার বক্তা ও শ্রোতা সকলকে তুমি কবুল করো। দাওয়াতে তাবলীগকে বিশ্বব্যাপী প্রসারিত করো।

টেলিভিশন- মোবাইল ও ওয়্যারলেস সেটে মোনাজাত

ইজতেমা মাঠে না এসেও মোনাজাতের সময় হাত তুলেছেন অসংখ্য মানুষ। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা মসজিদ মাঠসহ বিভিন্ন এলাকায় ওয়্যালেস সেটে, মুঠোফোনের মাধ্যমে মোনাজাত প্রচার করা হয়। এসব স্থানে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। আবার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করার কারণে অনেকে বাসায় বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন।

শেষ দিনে বয়ানকারী

বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের শেষ দিন রবিবার বাদ ফজর থেকে হেদায়েতীর বয়ান করেন তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি ভারতের হজরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ। বয়ানের বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা ওয়াসিফুল ইসলাম।

হেদায়েতী বয়ানে যা বলা হয়

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ হেদায়েতী বয়ানে বলেন, দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতের প্রতি আমাদের বেশি করে খেয়াল রাখতে হবে। দুনিয়ার জিন্দেগীর চেয়ে আখেরাতের জিন্দেগী হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী। আমাদের ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মত পেরেশানি ধেয়ে আসছে। এ পেরেশানি থেকে রক্ষার জন্য আমাদের ঈমানি শক্তিকে আরো মজবুত করতে হবে। ধাবিত হতে হবে আখেরাতের দীর্ঘ জিন্দেগীর দিকে। যিনি এখলাছের সাথে দীনের কাজ করবেন তিনিই কামিয়াব হবেন। আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনার মাধ্যমে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। চোখের পানি ফেলে মোনাজাত করতে হবে। মোনাজাত কবুল হলেই আমরা পাপমুক্ত হব। দুনিয়া ও আখেরাতে ফিরে আসবে শান্তি। দীনের ঘরে বসে ইবাদতের চেয়ে বাইরে মেহনত করে ইবাদত বন্দিগী করা অনেক ফজিলত। আল্লাহ তার বান্দাদের দীনের কাজে রাস্তায় বের হতে হুকুম দিয়েছেন। সকলকে দীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার কথা বলেছেন। আর এ দাওয়াতের জন্য তালিম নিতে হবে। মহল্লায়-মহল্লায় মসজিদে বসে দীনের দাওয়াত নিয়ে পরামর্শ করতে হবে। এতে শত্রুও বন্ধু হয়ে যেতে পারে।

বিদেশি মেহমান ৩৫ হাজার

এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ কমপক্ষে ৯০টি দেশের তাবলিগ জামাতের প্রায় ১০ হাজার বিদেশি মেহমান এবারের ইজতেমায় অংশ নেন। এদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক বিদেশি মেহমান আগমন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাবলিগের কাজে বের হওয়ার জন্য এবার ইজতেমা স্থলে প্রথম পর্বে প্রায় সাড়ে তিন হাজার জামাত তৈরি হয়েছে বলে ইজতেমার আয়োজকসূত্রে জানা গেছে। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে এসব জামাত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে জানিয়েছে তাবলিগ সূত্র।

আরো চার মুসল্লি­র মৃত্যু

শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল পর্যন্ত বিশ্ব ইজতেমা মাঠে আরো চার মুসল্লি মারা গেছেন। এরা হচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার মৃত রূপচাঁদ সরকারের ছেলে মকবুল হোসেন (৭৫), একই জেলার মোক্তার হোসেনের ছেলে তোয়াজ্জেল হোসেন (৫৯), সিলেটের সামসুদ্দিনের ছেলে সাইদুর রহমান (২০) ও গাজীপুরের কালীগঞ্জের মৃত সাহেব আলীর ছেলে সোবহান (৭০)। এ নিয়ে ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০-এ।

মুসল্লিদের দুর্ভোগ

এ বছর ইজতেমা মাঠের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগের অভাবে বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ বয়ান শুনতে এবং মোনাজাতে শামিল হতে দারুণ অসুবিধা ও ভোগান্তিতে পড়েন। ইজতেমা ময়দানের প্যান্ডেলের বাইরে পর্যাপ্ত মাইক সংযোজন ব্যবস্থা না নেয়ায় অনেক মুসল্লি­ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশ্ব ইজতেমা মাঠে নারী মুসল্লিদের সুযোগ সুবিধা না থাকলেও মোনাজাতে শরিক হতে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ নারী টঙ্গীর আশপাশে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান নিয়ে মোনাজাতে অংশ নেয়। আবার অনেকে নদীর পাড়ে বা আশপাশে খোলা আকাশের নীচে অবস্থান নেন তারা। অজু, গোসল, খাওয়া-দাওয়াসহ ভোগান্তির শেষ ছিল না তাদের।

মোনাজাত শেষে যানজট  ও জনজট

আখেরি মোনাজাত শেষ হওয়ার পর পরই বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষ নিজ গন্তব্যে পৌঁছার চেষ্টা করেন। আগে যাওয়ার জন্য মুসল্লি­রা তাড়াহুড়া শুরু করলে টঙ্গীর আশপাশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট। এতে টঙ্গীর কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী- কালীগঞ্জ সড়কের আহসান উল্লাহ মাষ্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের সড়ক-মহাসড়ক এবং সংযোগ সড়কগুলোতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ জনজট ও যানজট।

মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যা

গতকাল ইজতেমা ময়দান ও টঙ্গী থেকে কোন মোবাইল ফোন অপারেটরের মাধ্যমেই দেশের বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। মাঝে-মধ্যে লাইন পেলেও মুহূর্তেই তা কেটে যাচ্ছিল। মোবাইল ফোন সেবাদানকারী কোম্পানিগুলো নেটওয়ার্ক সুবিধা দিতে ইজতেমা উপলক্ষে ইজতেমার আশপাশ এলাকায় অতিরিক্ত মোবাইল টাওয়ার সংযোগ করেও এ সমস্যার পুরো সমাধান দিতে পারেনি।

দ্বিতীয় পর্বে যেসব জেলা অংশ নেবে

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে ৩৩টি জেলা ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ৪০টি খিত্তায় অংশ নিবেন। জেলা ও  খিত্তাগুলো হচ্ছে ১ ও ২ নং খিত্তায় নারায়ণগঞ্জ জেলা, ৩ ও ৪ নং খিত্তায় ঢাকা জেলা, ৫ নং খিত্তায় কক্সবাজার জেলা, ৬ নং খিত্তায় মানিকগঞ্জ জেলা, ৭ নং খিত্তায় পিরোজপুর জেলা, ৮ নং খিত্তায় পটুয়াখালী জেলা, ৯ নং খিত্তায় টাঙ্গাইল জেলা, ১০ নং খিত্তায় জামালপুর জেলা, ১১ নং খিত্তায় বরিশাল জেলা, ১২ নং খিত্তায় নেত্রকোনা জেলা, ১৩ নং খিত্তায় কুমিল্লা জেলা, ১৪ নং খিত্তায় মেহেরপুর জেলা, ১৫ ঝিনাইদহ,  ১৬, ১৭ ও ১৮ নং খিত্তায় ময়মনসিংহ জেলা, ১৯ নং খিত্তায় লক্ষ্মীপুর জেলা, ২০ নং খিত্তায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, ২১ নং খিত্তায় কুড়িগ্রাম জেলা, ২২ নং খিত্তায় বগুড়া জেলা, ২৩ নং খিত্তায় পঞ্চগড় জেলা, ২৪ নং খিত্তায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা, ২৫ নং খিত্তায় নীলফামারী জেলা, ২৬ নং খিত্তায়  নোয়াখালী জেলা, ২৭ নং খিত্তায় ঠাকুরগাঁও জেলা, ২৮ নং খিত্তায় পাবনা জেলা, ২৯ নং খিত্তায় নওগাঁ জেলা, ৩০ ও ৩১ নং খিত্তায় মুন্সিগঞ্জ জেলা, ৩২ নং খিত্তায় মাদারীপুর জেলা, ৩৩ নং খিত্তায় গোপালগঞ্জ জেলা, ৩৪ নং খিত্তায় সাতক্ষীরা জেলা, ৩৫ নং খিত্তায় মাগুরা জেলা, ৩৬ নং খিত্তায় কুষ্টিয়া জেলা, ৩৭ নং খিত্তায় সুনামগঞ্জ জেলা ও ৩৮ নং খিত্তায়, খুলনা জেলা ও ৩৯ নং খিত্তায় মৌলভীবাজার জেলার জন্য নির্ধারণ করা রয়েছে।

ইজতেমার আয়োজক কমিটির মুরুব্বী মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রথম পর্বের ইজতেমা শেষ হওয়ার পর ময়দানের সকল আবর্জনা-নোংরা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেয়া হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ৪ দিন বিরতি দিয়ে আগামী ১৬ জানুয়ারি থেকে ৫০তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। শেষ হবে ১৮ জানুয়ারি।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here