জনতার নিউজঃ

 

আইভীর পক্ষে ‘ঐক্যবদ্ধ’ আওয়ামী লীগ

সকল জল্পনা-কল্পনা আর নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এবার নির্বাচনে প্রার্থী হতে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার নিজের ‘অনাগ্রহের’ জায়গায় চূড়ান্ত পর্ব পর্যন্ত ‘অনড়’ থাকায় বিএনপির ধানের শীষ সাখাওয়াতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নৌকার প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভীর পক্ষে কেন্দ্রের কড়া নির্দেশে আজ বুধবার থেকে মাঠে নামছে ‘ঐক্যবদ্ধ’ আওয়ামী লীগ। ফলে দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে আগামী ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনে মূল লড়াই জমছে আইভী ও সাখাওয়াতের মধ্যে।

কে এই সাখাওয়াত? শুধু বাইরের লোকজনের কাছে নয়, খোদ নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ মানুষের কাছেও নামটি তেমন পরিচিত নয়। এমনকি স্থানীয়   বিএনপির নেতা-কর্মীদের সবাই যে তাকে আগে থেকে চেনেন তাও নয়। দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও দলীয় কর্মসূচিতে তেমন সক্রিয় কোনো মুখ নন তিনি, যদিও তিনি জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি।

সাখাওয়াতের মূল পরিচয় আইনজীবী হিসেবে, নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালত ও স্থানীয় আইনজীবীদের কাছে তিনি সুপরিচিত। জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতিও তিনি। তবে সব পরিচয়কে ছাপিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আলোচনায় আসেন নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলায় আসামিদের বিপক্ষে ও বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে লড়ার কারণে। বিশেষ করে, চাঞ্চল?্যকর এই সাত খুনের ঘটনায় নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পালের পক্ষে মামলায় লড়ার কারণে গত দুই বছরে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। বলা চলে, বিএনপির তুলনায় এটিই এখন তার মূল পরিচয়। আর নির্বাচনে বৈতরণী পার হতে এই পরিচয়কেই প্রধান পুঁজি করতে চান সাখাওয়াতসহ বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

স্বল্প পরিচিতির হলেও ভোটের মাঠে সাখাওয়াত ফ্যাক্টর হচ্ছেন ‘ধানের শীষ’ টিকিটের কারণে। মূল ভোটযুদ্ধ যে আইভী বনাম সাখাওয়াতের মধ্যেই হবে, সেটির প্রায় সব ধরনের আলামত এরইমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাখাওয়াতের নাম ঘোষণার পরপরই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা তার পক্ষে খণ্ড-খণ্ড মিছিল করেছেন, কেউ কেউ মিষ্টি বিতরণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাত বছর পর চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে স্থানীয় বিএনপিতে। সাখাওয়াতকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে বিএনপি নেতা রিজভী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। আর আইভীর পক্ষে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকা জুড়ে মিছিল, গণসংযোগ শুরু হয়ে গেছে গত শুক্রবার তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই।

আইভীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগঃ আইভীর পক্ষে নারায়ণগঞ্জের বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটির কেন্দ্র। উদ্যোগের অংশ হিসেবে গতকাল দলের স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও মেয়র প্রার্থী আইভীসহ জেলা নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি সকল মতভেদ ভুলে আইভীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য সব পক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে কোনো বিভেদ বা অনৈক্য বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন।

আগেরদিন সন্ধ্যায় ঢাকায় তাদেরকে নিয়ে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বৈঠকে ওবায়দুল কাদের সাফ বলে দিয়েছেন, আইভীর পক্ষে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। বিএনপি প্রার্থী দেওয়ায় এবং দলীয় সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের ঐক্যের বার্তা নিয়ে আইভীর পক্ষে আজ থেকে মাঠে নামতে পারেন শামীম ওসমানসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের সকল পক্ষ।

বিএনপির উদ্যোগঃ আওয়ামী লীগের মত বিএনপিও ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে গুরুত্ব দিচ্ছে দল-জোটের স্থানীয় সকল নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার ওপর। বিশেষ করে, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার করা বারবার অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়ে চূড়ান্তভাবে অনাগ্রহ দেখিয়ে মনোনয়ন না নেওয়া তৈমুর আলম যেন অভিমানে না থেকে সাখাওয়াতের পক্ষে মাঠে সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকেন সে চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে তৈমুর আলম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের দলের চেয়ারপারসন আমাকে একাধিকবার প্রার্থী হতে অনুরোধ করেছেন, কিন্তু আমি যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে ওনাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। তবে আমি দল কিংবা চেয়ারপারসনের নির্দেশের বাইরে থাকব না, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে কাজ করব।’

২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম ‘নির্দলীয়’ নির্বাচনে মেয়র পদে তৈমুর আলম খন্দকারকে বিএনপি সমর্থন দিলেও ভোটের আগের রাতে তাকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়। দলের ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মনোকষ্টের কথা বলেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর।

এদিকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর গতকালই নারায়ণগঞ্জে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির সাখাওয়াত। এ সময় তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় বিএনপির ভোট ৬০ ভাগেরও বেশি। সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি এ নির্বাচনে জিতবে।’ প্রথমদিনেই আইভী ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এই আইনজীবী বলেন, ‘আইভীসহ আওয়ামী লীগ নেতারা এখনো ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। আইভী সিটি করপোরেশন থেকে এখনো পদত্যাগ না করে নগর ভবন ও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। জেলা পরিষদের প্রশাসক আবদুল হাই জেলা পরিষদে বসে শলাপরামর্শ করছেন। এসব কারণে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ আছে, মানুষ ভোট দিতে চায়।’

বিএনপির মনোনয়ন প্রাপ্তি প্রসঙ্গে সাখাওয়াত বলেন, ‘এটা আমার জন্য বড় অর্জন। আমি এর প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করব। আমি সবসময় ন্যায়ের পক্ষে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছি, ভবিষ্যতেও করে যাব। ভোটাররা সেটি মূল্যায়ন করবেন বলে আমার বিশ্বাস আছে।’ তিনি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন এবং নিজের পছন্দমতো ভোট দিতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে।’ এজন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে মেয়র হিসেবে আইভী গতকাল নগরভবনে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। আজ বুধবার মেয়র পদ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করে নগরভবন ছাড়ছেন। নগরভবন ছাড়ার আগে তিনি নিজের অর্জন, ব্যর্থতা ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা হওয়ার পর ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি আইভী প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রথম নির্বাচনের আগে কিছুদিন প্রশাসক নিয়োগ করায় ওই সময়টুকু ছাড়া একটানা গত ১৩ বছর নগরভবনের প্রধান ছিলেন আইভী। ফলে এই ভবনের সঙ্গে তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। গতকাল শেষ বিকালে নগরভবন ছেড়ে যাওয়ার সময় আইভী বললেন, ‘নারায়ণগঞ্জের মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, তারা আমাকে অনেক দিয়েছেন, আমিও চেষ্টা করেছি প্রতিদান দেওয়ার। আমার বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জের ভোটাররা আবারও আমাকে ভোট দেবেন, আমি সবার দোয়া চাই।’

জানা গেছে, গতকাল বিকাল ৫টা পর্যন্ত মেয়র পদে আরো দুজন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তারা হলেন মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ (জাসদ) ও মেজবাহ উদ্দিন বুলু (স্বতন্ত্র)। এ নিয়ে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র নিলেন ৮ জন। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৭ ও কাউন্সিলর পদে ১৮৫ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here