J News

আইএসের ‘দায় স্বীকার’ রিটা ছাড়া সবার কাছে অদৃশ্য

বর্তমানে কোনো দেশে সন্ত্রাসী হামলার পর একটি খবর মিডিয়ায় প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে -আর তা হলো, ‘হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস’। যে সূত্র থেকে প্রায় সবাই এই খবর প্রকাশ করে তা হলো বিশ্বব্যাপী জঙ্গি কার্যক্রম নজরদারি করার প্রতিষ্ঠান সার্চ ফর ইন্টারন্যাশনাল টেররিস্ট এনটিটি ইন্টেলিজেন্স। এটি ‘সাইট’ নামে পরিচিত। সাইটের প্রধান হলেন রিটা কাট্জ। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক। তিনি ছাড়া আর দু’জন স্টাফ আছেন এই প্রতিষ্ঠানে। এদের একজন হলেন ব্রুস হফম্যান এবং অন্যজন রোহান গুনরত্ন। এরা রিটা কাটেজর উপদেষ্টা। তিনজনের এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বে আলোচিত নাম। কারণ, কোথাও সন্ত্রাসী হামলা হলেই ইরাক ও সিরিয়া ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নামে দায় স্বীকারের খবর দিচ্ছে এই ওয়েবসাইট। সাইটের দেয়া তথ্য অন্ধের মতো বিশ্বাস করে তা প্রকাশ করছে বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম।

অথচ এই ওয়েবসাইটের দেয়া তথ্যের সত্যতা অনেক আগে থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। এর কারণ হচ্ছে, রিটা কাটেজর নীতি হচ্ছে তিনি যা বলেন, তাই-ই বিশ্বাস করতে হবে। তথ্যের উত্স কি তা জিজ্ঞাসা করা যাবে না! জিজ্ঞাসা করলেও জবাব পাবেন না। ‘গ্লোবাল রিসার্চ’ নামের কানাডা ভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জঙ্গি কার্যক্রম নজরদারি নিয়ে মার্কিন সরকার ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সাইট একসময় কাজ করেছে। একারণে এটির দেয়া তথ্য গণমাধ্যম অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের মধ্য আগস্ট থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো সাইটের বরাত দিয়ে একের পর এক সংবাদ পরিবেশন করে চলেছে। অথচ বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব সংবাদসংস্থা সাইটকে জিজ্ঞাসা করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা যে খবর দিয়েছে তা ‘সত্য কি না’ কিংবা এই খবর তারা ‘কোথায় পেয়েছে’। যা দিচ্ছে তাই ছাপা হচ্ছে, এটা সাংবাদিকতার নীতি হতে পারে না।

কেবল গ্লোবাল রিসার্চ নয়, বিশ্বের অগণিত মিডিয়ায় বিভিন্ন সময়ে রিটা কাটেজর দেয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এমনকি সাইটের সরবরাহ করা ‘আইএসের শিরোশ্ছেদের’ একটি খবর যে ভুয়া তা প্রমাণ করার দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নোডিস ইনফো, বিফোর ইট’স নিউজসহ সংবাদভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান। নোডিস ইনফো চলতি বছরের ১২ জুলাই একটি ভিডিও ফাঁস করেছে যাতে দেখা যায়, আইএসের নামে ভূয়া শিরোশ্ছেদের ওই ভিডিও তৈরী করা হচ্ছে একটি স্টুডিওতে। রীতিমতো সিনেমার আদলে শ্যুটিং করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এজাতীয় ভূয়া ভিডিও তৈরী হয় রিটা কাটেজর নিজস্ব স্টুডিওতে। সাইটের পরিবেশন করা ‘আইএসের দায় স্বীকার’ সম্বলিত আরেকটি পোস্টে রক্তাক্ত মরদেহের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে তা ফটোশপ করা, এমন দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এমনকি বিদ্রুপ করে বলা হয়, আইএসের কোনো হামলার খবর আইএস নিজে পাবার আগেই পেয়ে যান রিটা কাট্জ।

গ্লোবাল রিসার্চ জানায়, রিটার সাইট যে কেবল সাধারণ গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করে চলেছে তা নয়, মার্কিন সরকারও একবার বিভ্রান্ত হয়েছিল। ২০০৭ সালে ওসামা বিন লাদেনের একটি ভিডিও বার্তা তারা পেয়েছে বলে দাবি করে। তত্কালীন মার্কিন সরকার সাইটের কাছ থেকে সেই ভিডিও সংগ্রহ করে গবেষণা শুরু করে। কিন্তু পরে দেখা যায় এটা আসলে ভূয়া লাদেন। সাইট পরিবেশিত সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস সম্পর্কিত একাধিক খবরও মিথ্যা বলে দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

তবে রিটা কাট্জ সবচে আলোচিত হয়েছেন বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার ঘটনায় আইএসের নামে দায় স্বীকারের তথ্য প্রকাশ করে। বাংলাদেশের সরকার এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি কঠোরভাবে অস্বীকার করলেও রিটা নাছোড়বান্দা। বাংলাদেশে আইএস হামলা চালাচ্ছে এগুলো প্রমাণ করতে ঘাম ছুটিয়ে চলেছেন তিনি। বাংলাদেশে ‘আইএসের’ হামলার খবর প্রকাশ করতে সাইট ছাড়াও তিনি ব্যবহার করছেন নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট।

টুইটারে তার হাজার হাজার ফলোয়ারের কাছে পৌছে দিচ্ছেন এই বার্তা। রিটার টুইটার অ্যাকাউন্টে ঢুকে দেখা যায়, রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যাকান্ডে আইএসের নামে দায় স্বীকারের খবর তিনি দিয়েছেন তিনি এই মাধ্যমেও। তবে রংপুরের পরিবর্তে তিনি লেখেন, ঢাকায় জাপানি নাগরিক হত্যা, দায় স্বীকার করেছে আইএস। পোস্টে তার নিচে মন্তব্য করেছেন বহু টুইটার ব্যবহারকারী। তাদের প্রায় ৯৫ শতাংই জানতে চেয়েছে আইএস কোন মাধ্যমে দায় স্বীকার করেছে, লিংক কই, দায় স্বীকারের স্ক্রিনশট দিতে পারবেন কিনা, আইএস কেন শুধু আপনাকে হামলার খবর জানায় ইত্যাদি ইত্যাদি। বলাই বাহুল্য এসব প্রশ্নের একটারও জবাব দেননি রিটা। রংপুরের পরিবর্তে ‘ঢাকায়’ হামলা হয়েছে উল্লেখ করায় তাকে তুলোধুনা করেন কেউ কেউ। বিপদ বুঝে এবার দুঃখ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ঢাকায় নয় রংপুরে হামলা হয়েছে।

সম্প্রতি বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলার পরেও আইএসের নামে দায় স্বীকারের তথ্য দেয় সাইট। টুইটারের মাধ্যমেও তিনি একই তথ্য প্রচার করছেন।  তবে ‘লিংক চাই লিংক চাই’ বলে যারা পাগল হয়েছেন তাদের জন্য এবার একটা লিংক দিয়েছেন এই ভদ্রমহিলা। তবে লিংকে ক্লিক করার পর দেখা গেল, এটা আসলে তার নিজের ওয়েবসাইট অর্থাত্ সাইট! আইএস ব্যবহার করে এমন কোনো মাধ্যমের লিংক তিনি এবারো দেননি।

বাংলাদেশে হামলার খবর প্রকাশ করার সময় রিটা কাট্জ কোথাও উল্লেখ করেননি, কোন মাধ্যমে আইএস দায় স্বীকার করল। অথচ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন হামলার পর কৃতিত্ব জাহির করতে তাদের নিজেদের প্রচারমাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন জিহাদি মাধ্যমে তা সরবরাহ করে। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমেও লিখিত অথবা ভিডিও বার্তা পাঠায় । যেমন গত ২ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনে একটি মসজিদে হামলার পর আইএস বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে দায় স্বীকার করেছিল, যা সবাই দেখেছিল। ফ্রান্সে হামলার পরেও ভিডিও বার্তা দিয়েছিল। টেক্সাসে একটি হামলার পর গত ৫ মে আইএস তার আল-বায়ান রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে দায় স্বীকার করেছিল। এছাড়া এই জঙ্গি সংগঠনটি আল-হায়াত মিডিয়া সেন্টার ব্যবহার করেও বিভিন্ন হামলার দায় স্বীকার করে প্রকাশ্যে। দায় স্বীকারের এসব বার্তা সবাই পড়তে পারে, দেখতে পারে, কিংবা শুনতে পারে।

কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে কোনো একটি স্থানে দুর্বৃত্তদের হামলা কিংবা নাশকতার পর ‘আইএসের দায় স্বীকারের’ বার্তাটি কেবলমাত্র রিটা কাট্জ পড়তে পারেন, দেখতে পারেন কিংবা শুনতে পারেন। বাকি সবার কাছে তা অদৃশ্য এবং অধরা।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here