অনন্ত জলিলের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছবিটি দেখতে গিয়ে এক অভাবিত অভিজ্ঞতা হয় আমার। এমনিতে ছবি দেখলে আমি দেখি বন্ধুর বাড়ির হাই ডেফিনেশন প্রজেক্টরে। সেখানে ব্লু-রে টেকনোলজি এবং লিংকন বা আরগোর মতো চলচ্চিত্রের সহজলভ্যতার কারণে সিনেমা হলে যাওয়ার ইচ্ছে আর অবশিষ্ট থাকে না। তারেক মাসুদের মাটির ময়নার পর কোনো ছবি হলে গিয়ে তাই দেখা হয়নি। নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও দেখার কথা ছিল না।
সারা দেশে তুমুল আলোড়ন তোলা এই ছবি সম্পর্কে তাই বলে অজ্ঞ ছিলাম না। জানতাম যে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ছবিটি দেখার জন্য। বাংলা ছবির ব্যবসার আকালের সময়ে এটি একটি ভালো খবর। কিন্তু ছবিটি বেশি আলোচিত হয়েছে মূলত ভিন্ন কারণে। এ ছবিতে নায়ক অনন্ত জলিল নিজের হূৎপিণ্ড বের করে দেখিয়েছেন ছবির নায়িকা বর্ষাকে। অনন্ত প্রথম আলোকে ব্যাখ্যা করে জানালেন যে নানা গল্প, উপন্যাস আর গানে হূদয় চিরে বের করার কথা বলা হয়। যা মানুষ বলে, তাই তিনি প্রতীকী দৃশ্য হিসেবে চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন। জুতসই ব্যাখ্যা। তাঁর অন্যান্য বক্তব্যও বাংলা ছবির গড়পড়তা নায়কদের তুলনায় পরিপক্ব ও সুবিবেচনাপ্রসূত।
কিন্তু তাঁর এসব ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয়নি। ইউটিউবের হূৎপিণ্ড বের করে দেখানোর রেকর্ডেড ভার্সনে শোনা গেল দর্শকের হাসি, ঠাট্টা আর বিদ্রূপের প্লাবনও। ঠিক যেন ‘মিস্টার বিন’ বা আমেরিকার কোনো চ্যানেলে কমেডি সিরিয়ালের মতো কিছু। বাংলাদেশের দর্শক নিশ্চয়ই সিলভেস্টার স্ট্যালোন, রজনীকান্ত আর গোবিন্দর বহু ছবি দেখেছে একসময়। সেখানে এমন উদ্ভট বহু দৃশ্য ছিল। কিন্তু কখনো তা দেখে কাউকে এমন সর্বজনীন বিদ্রূপাত্মক আনন্দে মেতে উঠতে দেখিনি। অনন্তের ক্ষেত্রে তাহলে কী হলো? সরেজমিনে তা জানতেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখতে যাওয়া।

২.

নির্ধারিত দিনে সিনে কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ছবিটি শুরু হয়ে গেছে। পর্দায় চলছে এক ছবি আর পর্দার সামনে দর্শকের সারিতে আরেক ছবি। হলভর্তি দর্শক চিৎকার করে, শিস দিয়ে, বিভিন্ন ও বিচিত্র শব্দের হাসি হেসে এক অভিনব দৃশ্যের অবতারণা করেছে। হকচকিত আমি স্থির হয়ে বসে লক্ষ করলাম, দর্শক মোটামুটি কয়েক ভাগে বিভক্ত। এক দল শুধু কিছু অতিনাটুকে দৃশ্য এবং অভিনয়ের সময় হাসছে। এটি হয়তো স্বাভাবিক ও বোধগম্য। কিন্তু আরেক দল প্রায় সারা সময়ে এমনকি ট্র্যাজিক কোনো দৃশ্যেও হাসছে। আরেক শ্রেণীর দর্শক শুধু হাসি নয়, নানা বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করে একধরনের ঘৃণা বা ক্রোধ প্রকাশ করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইংরেজিতে কোনো শব্দ ছবিতে উচ্চারিত হওয়ামাত্র তা পুনরায় উচ্চারণ করে বিচিত্র শব্দের হাসিতে ফেটে পড়ছে। আমার একপাশে বসেছেন দুই তরুণ। ঠিক পেছনে তাঁদের কয়েকজন সঙ্গী-সঙ্গিনী। এম্বাসেডর শব্দটি প্রায় নির্ভুলভাবে ভিলেন উচ্চারণ করামাত্র তাঁদের একজন আরও বিকৃত উচ্চারণে বলে উঠলেন: ‘ইঠ ইজ শো ফানি’!

আমি হতবাক ও বেদনার্ত হূদয়ে সারাটা সময় একশ্রেণীর দর্শকের এসব কর্মকাণ্ড দেখলাম। এ দেশে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে বহু শিক্ষিত মানুষের ইংরেজি এমনকি বাংলা উচ্চারণের ঠিক নেই। তিনটি দেশে পড়াশোনা করার পর আমি নিজেও বহু ভুল করি আজও। এখনো আমিসহ বহু মানুষ টেলিভিশন চ্যানেলে ‘এবং’ বা ‘একক’—এ ধরনের শব্দ এবং ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান-সম্পর্কিত বহু বাংলা শব্দ ভুলভাবে উচ্চারণ করি। অনন্ত জলিলের ইংরেজি ভুল উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি করা দর্শকের সবাই (‘ইঠ ইজ শো ফানি’ বলা দর্শকটিসহ) কি পুরোপুরি শুদ্ধ উচ্চারণ শিখে গেল? আর তা শিখে গেলেও এভাবে একজনকে উচ্চারণের জন্য আক্রমণাত্মক বিদ্রূপ করা কিসের লক্ষণ?

অনন্ত জলিলের ‘ফম গানা’ নিয়ে এর আগে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। একটি চ্যানেলের উপস্থাপিকা এ নিয়ে এবং আরও বিষয়ে তাঁকে অপমানজনকভাবে প্রশ্ন করে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করেছেন। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ অনলাইনে প্রচার করে এ নিয়ে আরেক দফা গণঠাট্টা-মশকরা করা হয়েছে। আমার ধারণা, বিভিন্ন গণমাধ্যমে (বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) কিছু স্যাডিস্ট মানুষের ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণার কারণে ‘অনন্তকে নিয়ে হাসতেই হবে, না হলে আপনি স্মার্ট নন’—এ ধরনের একটি মাইন্ড-সেট তৈরি হয়েছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। অনন্তের স্ত্রী বলে হয়তো বর্ষাকে নিয়েও একই ধরনের বিদ্রূপ আর ইয়ার্কি দেখা গেছে কিছু মানুষের মধ্যে।

অথচ বাংলাদেশে গড়পড়তা ছবির তুলনায় অনন্ত জলিলের ছবিতে কিছু দৃশ্যায়ন (বিশেষ করে গান ও মারামারির দৃশ্য) আকর্ষণীয়, নির্মাণকৌশল তুলনামূলকভাবে শ্রেয়তর, অনন্ত ও বর্ষার পর্দা উপস্থিতিও যথেষ্ট নায়ক-নায়িকাসুলভ। অনন্ত জলিল ও তাঁর ছবি নিয়ে একশ্রেণীর শহুরে দর্শকের এত ঠাট্টা-মশকরার আয়োজন কেন তাহলে? সেটা কি অতিসাধারণ পরিবার থেকে আসা অনন্তের সাফল্য ও আত্মবিশ্বাসের কারণে? সেটা কি শ্রেণী অবস্থান নিয়ে আইডেনটিটি ক্রাইসিসে ভোগা মানুষের কৃত্রিম অহমবোধের কারণে? অনন্তকে ঠাট্টা-মশকরা করে নিজের শ্রেণী উত্তোরণ ঘটেছে তা নিজেকে ও অন্যদের বোঝানোর জন্য? কিছু দৃশ্যে অনন্তের অতিনাটুকে অভিনয় ও ভুল উচ্চারণে হয়তো হেসেছে বোদ্ধা বা উচ্চারণ পারদর্শী দর্শক। বাকিরা কি মাত্রাতিরিক্ত হাসাহাসি করেছে অনন্তের চেয়ে নিজেদের আলাদা বোঝানোর হাস্যকর তাগিদ থেকে?

৩.

নিজের মাটির সন্তানের প্রতি এমন নিষ্ঠুর হাসি-ঠাট্টা হয়তোবা আরও বড় সংকটের প্রতিচ্ছবি। আমার কেন যেন মনে হয়, তরুণদের মধ্যে ভয়াবহ একটি শ্রদ্ধাহীন অংশের বিকাশ হচ্ছে এ দেশে। তাদের সামনে কোনো আইডল নেই, শ্রদ্ধা করার মতো কোনো মানুষ নেই। তাদের দোষ দিই না। তাদের সামনে দেশের বরেণ্য মানুষকে নিরন্তর গালিগালাজ করে এ পরিস্থিতি তৈরি করেছি আমরা বয়োজ্যেষ্ঠরাই।

আমরা বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েটকে বিনা দ্বিধায় আখ্যায়িত করি সুদখোর হিসেবে। যে বিচারপতির প্রজ্ঞা, জ্ঞান আর সততা নতুন প্রজন্মের কাছে হতে পারত আলোকবর্তিকার মতো, শুধু গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলার রায় দেওয়ার জন্য তাঁকে দালাল আর রাজাকার হিসেবে অভিহিত করা হয় অনলাইন আড্ডায়। যে নেত্রী তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, তাঁর জন্মের বৈধতা আর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। যে প্রবীণতম সাংবাদিক সবার শ্রদ্ধার দাবিদার, তাঁকে গালাগালি করা হয় অশ্রাব্য ভাষায়। সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, রাজনীতিক, উপাচার্য, সাংসদ, সচিব—কারও ভাষাই সুশ্রাব্য নয়। একের চোখে অন্য খারাপ বা খুবই জঘন্য। এমন এক সমাজে অনন্ত জলিল সম্পর্কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, হাসি-ঠাট্টা হয়তো স্বাভাবিক বিষয়।

কিন্তু তবু তা স্বাভাবিক হিসেবে মানতে পারি না আমি। কারণ, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান অনন্ত এক অর্থে এ দেশের অধিকাংশ পরিবারের প্রতিনিধি। যে পরিশ্রম আর অধ্যবসায় থেকে অনন্ত একজন গার্মেন্টসকর্মী থেকে অনেক গার্মেন্টসের মালিক হয়েছেন, তাঁর দানশীলতা ও পরোপকারের যেসব ঘটনা জানা যায়, যেভাবে তিনি বিদেশি সংস্কৃতির আধিপত্যের যুগে সাহস করে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বাংলা ছবি বানিয়ে দর্শক টেনে আনছেন, তাঁর প্রতিটি বিষয় বরং প্রশংসনীয়।

অনন্তের কাছে বাংলা ছবির বিশুদ্ধ ব্যাকরণ বা গভীর মতাদর্শ কোনো কোনো দর্শক আশা করতে পারেন। কিন্তু তাহলে তাঁদের উচিত হবে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা না দেখে তারেক মাসুদ বা গোলাম রব্বানী বিপ্লবের ছবিগুলো দেখা। অনন্তের কাছে তরুণ প্রজন্মকে ইংরেজি শেখানোর দায়িত্ববোধ কেউ কেউ হয়তো আশা করেছেন। তাঁদের উচিত হবে এইচবিও খুলে বসে থাকা। অনন্তের কাছে খুব মেধাবী কিছু কেউ আশা করলে তাঁদের উচিত, প্রথমে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের মাথাদের কাছে মেধার চর্চা আশা করা।

৪.

অনন্তকে স্রেফ একজন এন্টারটেইনার হিসেবে দেখাটাই বরং শ্রেয়। অনন্তের চেয়ে বহুগুণে অতিনাটুকে হওয়ার পর এন্টারটেইনার রজনীকান্ত যদি দক্ষিণ ভারতে দেবতুল্য হতে পারেন, অনন্ত তাহলে আর যা-ই হোক, ঠাট্টা-মশকরার পাত্র হতে পারেন না। অনন্ত যেটুকু সাফল্য পেয়েছেন, তার প্রশংসা করা উচিত। তাঁর কাছে আরও ভালো কিছুর প্রত্যাশা আমরা ব্যক্ত করতে পারি। কিন্তু তাঁকে ক্লাউন ভেবে নিয়ে অসুস্থ আত্মতৃপ্তি পাওয়ার প্রয়োজন নেই।

আমাদের একজন মন্ত্রী শাহরুখের মতো মেলোড্রামা করা অভিনেতার অনুষ্ঠান দেখার জন্য গদগদ হয়ে মাটিতে বসে পড়েছিলেন। হাসি-ঠাট্টা করলে এ ধরনের লোকদের নিয়ে করাটাই ভালো, অনন্তকে নিয়ে নয়। অনন্ত আমাদের সন্তান। তাঁকে অসহ্য মনে হলে বর্জন করুন। কিন্তু তাঁকে একজন অদ্ভুত আগন্তুকের মতো ধরে নিয়ে এমন ঠাট্টা-মশকরার কারণ নেই।

অনন্ত সিনেমায় যা করেন, তার চেয়ে অনেক উদ্ভট, অবিশ্বাস্য ও অরুচিকর কাণ্ড ঘটান এ দেশের অনেক রথী-মহারথী। আমাদের চারপাশে দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন অসংখ্য অনন্ত জলিল। তাঁদের সবকিছু মেনে নিয়ে এক অনন্তকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলা অদ্ভুত এক হিপোক্র্যাসি ছাড়া অন্য কিছু নয়।Ananta

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here