image_80027
ঈদের আগেই পাঠকদের জানানো হয়েছিল যে শাকিব এই ঈদেও তার নিজের সাথেই নিজে লড়বেন। ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো হলো মালেক আফসারীর ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল’, শাফিউদ্দিন শাফির ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’, রকিবুল আলম রকিবের ‘প্রেমিক নাম্বার ওয়ান’ এবং শাহ মোহাম্মদ সংগ্রামের ‘কি প্রেম দেখাইলা।’

ছবির বাজার বা ব্যবসার কথা চিন্তা করলে মালেক আফসারীর ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল’ কিছুটা এগিয়ে হল বুকিংয়ের দিক দিয়ে। কিন্তু ছবির গল্প আর চিত্রনাট্যে নতুন কিছু কী আছে? মডেল ববি এর আগে চলচ্চিত্রে আইটেম সং করে যে পরিমাণ আলোচনায় ছিলেন এ ছবিতে পুলিশ চরিত্রের শাকিবের বিপরীতে দুর্বল ও সেকেলে ডায়লগে শাকিব-ববির কেমিস্ট্রি যেন বড়ই বেমানান লাগল। বিশেষ করে ছবিটি রিলিজের আগে এই জুটির একটি টিভি কমার্শিয়াল রিলিজ হয়। একটি কোমল পানীয়র এই বিজ্ঞাপনে তাদের যে মানের অ্যাকশন ও সিক্যুয়েন্স দেখানো হয়েছে এখানে তার সিকিভাগও খুঁজে পাওয়া গেল না। তাই ছবির ভাষা যখন ক্রমাগতভাবে বদলেছে সেখানে সেই একই একঘেয়ে ইমোশন আর একই ধরনের ডায়লগে ভরপুর ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল’। তবে ছবিটি ৮৬টি হলে একসাথে মুক্তি দিয়ে একটি রেকর্ড গড়েছে। ব্যবসায়িক খাতিরে এটিকে রেকর্ড বললেও ছবিটির মান বলেছে ভিন্ন কথা।

এবারে আসা যাক, শাফিউদ্দিন শাফির ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ছবিটির দিকে। ছবিটির চিত্রনাট্যকার রুম্মন রশীদ খান একজন তরুণ সাংবাদিক, নাট্যকার ও মিডিয়াকর্মী। তাই তিনি নিজ উদ্যোগেই ফেসবুকসহ নানান গণমাধ্যমে ছবির নানামুখী প্রচারের তোড়ে বাড়তি এক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল বটেই। তাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল একেবারে নতুন কিছু পাব। এর পাশাপাশি জয়া আহসানের মতো এত গুণী অভিনেত্রী তার প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কতটা সাফল্যের সাক্ষী রাখেন সেটিই যেন দেখার বিষয় ছিল। কিন্তু এক তরুণ চিত্রনাট্যকারের কলমেও সেই একই মানের ডায়লগ আর কাহিনী দেখে যারপরনাই হতাশ হতেই হয়। তবে কি এই প্রজন্মের হাতেও গল্পের কোনো উন্নয়ন হবে না? হলে গিয়ে যারা ছবিটি দেখতে যাবেন তারা তো সমসমায়িক হলিউড বলিউডের ছবিগুলোও দেখেই এসেছেন রুম্মনের ছবিটি দেখতে। তাদের কাছে কি নতুনত্ব দিলেন তিনি চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা? প্রশ্ন থাকল তার কাছে? ছবির গল্পে নেই কোনো টেনশন, টানটান উত্তেজনা তো অনেক দূরের, নতুন কোনো ক্লাইমেক্স নেই যা নতুন করে কিছু দেখেছে দর্শকেরা। জয়া আহসানের ‘আকাশ হতে চাই’ গানটিতে মনে হলো নায়িকা তার নাচের মুদ্রায় টেনশন দিতে গিয়ে কোন অ্যাক্রোবেট প্লেয়ারের মতো অনেক কসরত করে নাচের মুদ্রা উপস্থাপনের চেষ্টা করে চলেছেন। নাচের টেনশনে জয়ার এক্সপ্রেশনের কোমলতা হারাচ্ছে যেন ক্রমশ! আর স্ক্রিপ্ট যাই হোক না কেন জয়া আহসানের অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন আসে না। বরং একাধিকবার বিভিন্ন কস্টিউমে ভিন্ন জয়াকেই দেখেছে দর্শকেরা। তবে শাকিব খানের কাছে এই ছবিটি নতুন কোনো কিছু হয়ে ধরা দেওয়ার কিছু নেই। শাকিব এমন ছবি করেই অভ্যস্ত। বরং একই ধারার ছবি করেও বাড়তি প্রচার পেলেন তিনি। মন্দ কী? এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় শুটিংকৃত কিছু গানের দৃশ্যে বাইরের সাধারণ মানুষের হাঁটাচলাও দেখানো হচ্ছে অবলীলায়। একটি প্রফেশনাল ছবির শুটিংয়ে এই দৃশ্যগুলো কেন এডিট করলেন না পরিচালক তা বুঝা মুশকিল। এ ছাড়া অনেক অসঙ্গতি হয়তো বলাই যাবে, কিন্তু প্রচারের তোড়ে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে ছবিটি। এমনকি ছবির কলাকুশলীকে দিয়ে খোদ প্রযোজক-কণ্ঠশিল্পীর গানটির যে প্রশংসা করানো হয়েছে বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানে সে তুলনায় নতুন কিছুই তো দেখাতে পারলেন না কলাকুশলীরা। এ ছাড়া ছবির টেলপের শুরুতে চিত্রনাট্যকারের নাম নেই। তবে কি পুরো কৃতিত্ব বা সমালোচনা পরিচালক শাফি নিজেই নেওয়ার চেষ্টা করেছেন? দেশের হ্যাটট্রিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার কবির বকুলের নামটিও স্থিরচিত্রের পরে। এইগুলো অবশ্যই নামের প্রতি অসম্মান জানানো। যাইহোক এগুলো হয়তো সাধারণ দর্শকদের ভাববার বিষয় নয়। তবে এটি ঠিক এই চলচ্চিত্রের কল্যাণে শওকত আলী ইমনের কম্পোজিশনে অনবদ্য কয়েকটি গান পেয়েছে দর্শক। আর প্রথম ছবির ভুল শুধরে পরের ছবিতে শুধু প্রচারের ঢোল না বাজিয়ে সত্যিকার অর্থেই পরবর্তী কোনো ছবিতে নিজের গল্পের চমকে দেখাবেন রুম্মন সেই প্রত্যাশাই রইলাম।

‘প্রেমিক নাম্বার ওয়ান’ ছবিটি অপু-শাকিবের ধরা বাধা কেমিস্ট্রির ছবি। হলে গিয়েও তাই ঠাওর হলো। ছবির গল্প অনেকেরই জানা। অর্থাত্ শাকিব অপুর এমন টাইপের গল্প পাশে বসা দর্শক এর আগেও দেখেছে বার কয়েক। সিঙ্গাপুরে চিত্রায়িত এই ছবিটিতে তাই শাকিব-অপু জুটি ভক্তদের স্বাধ মিটিয়েছে বলা যায়। আর শাকিব, মিশা সওদাগরের অ্যাকশন আর আক্রোশের ডায়লগ দেখে দর্শকদের বার কয়েক হাততালি শোনা গেল। বুঝা গেল শাকিব-অপু আর মিশার এই ত্রয়ী জুটির যে এক নির্দিষ্ট দর্শক রয়েছে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট তাদের ছবি নিয়ে। পরিচালকও বোধকরি তার টার্গেট অডিয়েন্সের প্রতিই বেশি নজর দিয়েছেন। তাই মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ক্যাটাগরির খাতিরে ছবিটি তাই সফল।

এবারে আসা যাক শাহ মোহাম্মদ সংগ্রামের ‘কি প্রেম দেখাইলা’ ছবিটির দিকে। তরুণ অভিনেতা বাপ্পী আর আঁচল দুজনই নিজেদের ক্যারিয়ারে এখন স্ট্রাগলিং পর্যায়ে রয়েছেন। তাদের নিয়ে একটি ছবি দর্শকদের হলে টানতে হলে যে বিষয়টার প্রতি গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো মজবুত গল্প। পুরো ছবিতে সেই ‘গল্প’ জিনিসটারই কোনো হদিশ পাওয়া গেল না। হলে গিয়ে বুঝা গেল যে, এই ছবিটি প্রথম আধঘণ্টা দেখে পরবর্তী আধঘণ্টা হলের বাইরে থেকে ঘুরে এসে আবার দেখতে বসলেও কাহিনী বা গল্পে কোনো মিসিং মনে হবে না। সবশেষে প্রশ্ন থাকে যে কতদিন আর এই একই গত্বাধা গল্প, একই অ্যাকশন বিন্যাস গিলব আমরা। কারণ যে দর্শক হলে বসে চরম বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে ঈদের এই ৪ ছবি উপভোগ বা বিরক্তিভোগ করেছে, তারাই তো ঘরে বসে ডিভিডিতে বা স্যাটেলাইটে বলিউডের ‘আওরঙ্গজেব’, ‘ইয়ে জাওয়ানি দিওয়ানি’ বা টালিউডের ‘মিশর রহস্য’ এইসব ছবি মেকিং আর গল্প দেখছে। সেই আধুনিক দর্শকদের শুধু ফেসবুকের জবরদস্ত প্রচারণা আর টিভি টকশোতে চিত্কার ‘অসাম অসাম’ বললে তো হবে না। প্রয়োজন প্রথমে দুর্দান্ত গল্প তেমনি আধুনিক মেকিং। কবে পাবে তা বাংলাদেশি দর্শক। এবারের ঈদের ছবি দেখে এক কথায় বলা যায়, ছবির গানগুলোর দৃশ্যায়নের বৈচিত্র্য ছাড়া ২০১৩ সালেও বাকি সবকিছুই এখনও ৮০-৯০ দশকেই আটকে আছি আমরা!

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here