নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারে হাইকোর্টের আদেশের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাহী বিভাগের কাজ নির্বাহী বিভাগ করবে। কেউ যদি অতি উত্সাহী হয়ে আদেশ দেন তাতে ঘটনার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হবে। এটা বুঝতে হবে। গতকাল বুধবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সূচনা বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর তার সরকার বসে থাকেনি। আমরা তাত্ক্ষণিক সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। কিন্তু কিছু লোকের অতি উত্সাহ কর্মকাণ্ড ও তত্পরতা এ কাজকে ব্যাহত করে। কথায় কথায় রিট, যে কাজ আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী ও নির্বাহী বিভাগের, সেখানে সব কাজ যদি বিচার বিভাগ করে তাহলে আমাদের কী করণীয় থাকে? আমরা তো অপেক্ষা করে থাকিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, অতি উত্সাহীদের কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন সন্ত্রাসীদের সজাগ করে দিচ্ছে, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ বাধাগ্রস্ত করছে। মনে হয় আমাদের হাত-পা বেঁধে ফেলে দিচ্ছে। এদিকে সবার নজর রাখতে হবে। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ থাকতে হবে। জুডিসিয়াল, লেজিসলেটিভ ও পার্লামেন্ট কেউ যেন একে অপরের কাজে বাধা সৃষ্টি না করে। প্রধানমন্ত্রী সকলকে ধৈর্য ধরার আহবান জানিয়ে বলেন, এ পর্যন্ত যে ব্যবস্থা নিয়েছি সে জন্য কারো কোন দাবি করতে হয়নি। যা যা ব্যবস্থা নেয়া দরকার আমরা নেব।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনার তদন্ত কাজ বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোন কাজ কাউকে না করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমি কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিইনি, দেবো না। এ সাত খুনের সঙ্গে যারা জড়িত, যাবে কোথায়? খুঁজে বের করে শাস্তি দেবো। যেই হত্যাকাণ্ড ঘটাবে সে যে দলেরই হোক ব্যবস্থা নেবো। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার র্যাব বিলুপ্তি দাবির কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর জিয়াউর রহমান সংবিধান লংঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে সেনাবাহিনীর অসংখ্য অফিসারকে হত্যা করেন। সে সময় ১৮/১৯টি ক্যু হয়। তিনি সংবিধান মানলেন না। সেনাবাহিনীর নিয়ম মানল না। তাহলে কি সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে দেয়া হবে? পুলিশের কেউ যদি অপরাধ করে তাহলে কী পুরো পুলিশ বাহিনীকে বাতিল করে দিতে হবে? তিনি বলেন, র্যাব খালেদা জিয়ার সৃষ্টি। র্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার উনিই করেন। এখন এটা ব্যবহার করতে পারছেন বলেই র্যাবকে সহ্য করতে পারছেন না। তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। জিয়াউর রহমান যেমন বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার ইমডেমনিটি দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, তেমনি তার স্ত্রী খালেদা জিয়া অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে যে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল তার বিচারও ইমডেমনিটি দিয়ে বন্ধ করে দেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের সময় খালেদা জিয়া আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। লন্ডন থেকে তার ছেলে ৪৮ বার কথা বলেছে কী উদ্দেশ্যে? সব রেকর্ড আছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় খালেদা জিয়ার আচরণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেখে মনে হচ্ছে যেন মাছের মায়ের পুত্র শোক।

বিভিন্ন অপরাধের সাথে যারা জড়িত তারা যাতে আওয়ামী লীগে ভিড়তে না পারে তার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পার্টিতে এসব লোকের দরকার নেই। আওয়ামী লীগ এমনিতেই সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল। হাবি জাবি নেবার দরকার নেই।

প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। বৈঠকের শুরুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপিত ও গৃহীত হয়। বৈঠকে আগামী ৭ জুন ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস, ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবসের কর্মসূচি চূড়ান্ত।

জানা গেছে, বৈঠকে নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তার গ্রেফতার বিষয়ে নেতৃবৃন্দ জানলে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের বিরুদ্ধে তো কোন মামলা নেই। কিভাবে গ্রেফতার করা হবে? তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণও তো এখনো পাওয়া যায়নি।

গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের ৬ জনের এবং পরদিন আরেকজনের লাশ ভেসে ওঠে। গত রবিবার এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে নারায়ণগঞ্জে সাতখুনে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে চাকরিচ্যুত র্যাব-১১ এর সাবেক কমান্ডারসহ তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। ওই তিন কর্মকর্তা হলেন র্যাব-১১ এর সাবেক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানা।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here