shagor runiসাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি এবং শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলার কোনো অগ্রগতি নেই।

চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গঠিত তদারকি সেলের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে সাগর-রুনি হত্যা মামলার বিষয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ বিস্তারিত অপরাধচিত্রের প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

আর পোশাকশ্রমিক-নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলার তদন্তের বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলে তদন্ত সেলের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্ত দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গঠিত তদারকি সেলের বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

তদন্তকাজে গতি আনতে ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য এই সেল গঠন করা হলেও গত ১১ মাসে এর কোনো বৈঠক হয়নি। চলতি মাসে দুবার বৈঠকের দিনক্ষণ ঠিক করা হলেও তা আবার পরিবর্তন করা হয়েছে। আগামী বুধবার বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদারকি সেলে কোনো মামলা তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাকিয়ে থাকেন সেলের নির্দেশনার দিকে। কিন্তু সেলের বৈঠক সময়মতো না হওয়ায় দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না। এই সেলের শেষ বৈঠক হয় ২০১২ সালের ৩ নভেম্বর। বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তদারকি সেলের সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, শিগগিরই বৈঠক হবে। গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকায় বৈঠকের তারিখ বদলাতে হয়েছে।

সাগরু-রুনির মামলার অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, শিগগিরই কিছু পাব বলে আশা করছি।’ অন্যান্য চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বৈঠক হলেই সব জানতে পারবেন।’

এবারের বৈঠকে নতুন ১৫টি ও পুরোনো ১০টি মামলা পর্যালোচনা করা হবে বলে সূত্র জানায়। এ ছাড়া নিষ্পত্তি হওয়া নয়টি মামলার বিষয়ে সেলকে অবগত করা হবে।

তদারকি সেলে ২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪১০টি মামলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন ২৫টি মামলা তদন্তাধীন আছে। এর মধ্যে সিআইডি ১৪টি, ডিএমপি পাঁচটি, কেএমপি একটি, র‌্যাব দুটি, জেলা পুলিশ একটি মামলা তদন্ত করছে।

জানতে চাইলে তদারকি সেলের সদস্যসচিব মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের হাতে যে মামলা আছে, তার প্রতিটির তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে।’

পুরোনো ১০টি মামলা: এই ১০ মামলার মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা ও পোশাকশ্রমিক-নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলা বেশ আলোচিত।

তদারকি সেলের ৭১তম সভার কার্যবিবরণীতে নিহত ব্যক্তিদের ভিসেরা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভিসেরায় কোনো ধরনের বিষাক্ত পদার্থ বা চেতনানাশক কোনো পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। নিহত ব্যক্তিদের সন্তান মাহির সারওয়ারের সামাজিক কাউন্সেলিং শেষ হলে তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে।

সভায় কার্যবিবরণীতে বলা হয়, হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মামলাটি যেহেতু বহুল আলোচিত, সেহেতু তদন্তকাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এরপর বিভিন্ন সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেছিলেন, হত্যাকাণ্ডের সব আলামত সন্তোষজনকভাবে পাওয়া যায়নি। যতটুকু পাওয়া গেছে, তার ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে দুটি ডিএনএ শনাক্ত করেছে। ওই দুটি ডিএনএর সঙ্গে এখানে যারা অপরাধী হিসেবে সন্দেহভাজন, তাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যদিও তা দুরূহ কাজ।

আমিনুল হত্যা: আমিনুল ইসলাম হত্যা মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে সিআইডি বলেছিল, ঘটনায় গোয়েন্দা সংস্থার কথিত ‘সোর্স’ মোস্তাফিজুর রহমান ও বোরকা পরিহিত অজ্ঞাতনামা নারীকে খুঁজতে বিশ্বস্ত চর নিয়োগ করা হয়েছে। ওই দুই ব্যক্তি ছাড়াও অন্য কেউ হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আগাম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, ক্রোকি ও হুলিয়া আদেশ জারি করা হয়েছে। তাঁদের খুঁজতে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

আমিনুল হত্যার বিচার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সে দেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা (জিএসপি) স্থগিত হওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হয়। গত ১৬ মাসেও এই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। সর্বশেষ গত ১০ জুন সরকার মোস্তাফিজুরকে ধরতে এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) সংগঠক এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নেতা ছিলেন। তিনি গত বছরের ৪ এপ্রিল আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হন। পরদিন তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে। বেওয়ারিশ হিসেবে আমিনুলের লাশ উদ্ধারের পর ঘাটাইল থানার উপপরিদর্শক শাহীন মিয়া অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। পরে আমিনুলের ভাই রফিকুল ইসলাম এ ঘটনায় সন্দেহভাজন মোস্তাফিজুর রহমান ও বোরকা পরিহিত অজ্ঞাতনামা এক নারীকে আসামি করে ঘাটাইল থানায় আরেকটি এজাহার দেন। এজাহারটি পুলিশের করা হত্যা মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। বোরকা পরিহিত ওই নারীকে নিয়ে আমিনুলকে ডাকতে গিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর।

অন্যান্য মামলা: এ ছাড়া রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হারিসুল ইসলাম, শাহজাহানপুরে আমতলা জামে মসজিদের সামনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা কাউছার আলী, জিগাতলা বিএনপির ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামান শিবলী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আফতাব আহমেদ, ধানমন্ডির শিক্ষিকা কাজী সুহিন নাহার, তুর্কি অ্যাসোসিয়েটসের পরীবাগ অফিসে রমজান আলী হত্যা মামলা এবং মীর হাজারীবাগ এলাকায় পরিবহন ব্যবসায়ী জুয়েল হোসেন ও তাঁর বন্ধু পোশাক ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন টুটুল হত্যা মামলার অগ্রগতিও বৈঠকে জানানো হবে। এর মধ্যে বেশির ভাগ মামলারই তদন্ত চলছে।

নতুন ১৫টি মামলা: এই ১৫টির মধ্যে আছে আলোচিত সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন হত্যা মামলা। তদারকি সেলের বৈঠকের জন্য তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মামলায় দুবার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। আদালতের আদেশে এখন আবার অধিকতর তদন্ত চলছে।

অন্য মামলাগুলো হলো সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী আকবর হোসেনের বাসায় গৃহপরিচারিকা বিলকিছ বেগম হত্যা মামলা।

সেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার আসামি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর ক্যাথলিক গির্জায় বোমা বিস্ফোরণ মামলারও।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেরেবাংলা নগরে ইউসুফ আলী অপহরণ মামলার আসামিদের শনাক্ত করা যায়নি। ফতুল্লায় রাজিবুল ইসলাম হত্যা মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। দাউদকান্দিতে অগ্রণী ব্যাংক থেকে টাকা চুরির মামলার আসামিদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামে এইচআরসি শিপিং লিমিটেডের জাহাজ এমভি বিরাজের কর্মকর্তা মুসা বিন সিরাজ হত্যা মামলার আসামি পাওয়া যায়নি। ফরিদগঞ্জে আবদুল্লাহ আল জাবের হত্যা মামলার পুনঃ তদন্ত চলছে।

খুলনার যুবলীগের নেতা শহীদ ইকবাল বিথার হত্যা ও পল্টন ময়দানে কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সমাবেশে বোমা হামলা মামলার শিগগিরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। নোয়াখালীর ফিরোজ উদ্দিন আহমদ, আদাবরে ওয়াহিদুজ্জামান রুমিজ, রিদওয়ানুল মহসিন হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইনজীবী দম্পতির মেয়ে করবী হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। আদালতের নির্দেশে গফরগাঁওয়ে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম ওরফে দুলাল ডাক্তার হত্যা মামলার তদন্ত স্থগিত আছে।

শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here